একাদশী, জন্মাষ্টমী আদি মাধব তিথিতে উপবাস থাকা সনাতন ধর্মীয় বিধির এক বিশেষ অঙ্গ। বৈদিক শাস্ত্রে বহুকাল পূর্ব থেকেই তা পালনের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু তিথি অনুযায়ী ব্রত দিবস নির্ধারণে বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত বা স্মার্ত আদি বিভিন্ন সম্প্রদায় ভেদে সমাজে আজ নানা বিভ্রান্তি। কেউ বলেন-“একাদশী তিথি আজ, রাতে তো অষ্টমী তিথি, কাল নবমীতে কেন অভিষেক-উপবাস করব?” ইত্যাদি। এত মতভেদ কীভাবে এবং কেন সৃষ্টি হলো সে বিষয়ে আলোচনা রচনার কলেবর বৃদ্ধি বিবেচনায় তা সংক্ষিপ্তকারে উপস্থাপনসহ প্রবন্ধে বিশেষত ব্রত দিবস নির্ণয়ে বিভ্রান্তি নিরসণ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হলো।
বৈষ্ণব স্মৃতিই পালনীয় কেন?(একাদশী)
মহাভাগবত শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীকৃত শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে (মধ্য.২৪/৩২৪-৩৪৪) উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু তদানীন্তন গৌড়াধিপতির প্রধানমন্ত্রী শ্রীল সনাতন গোস্বামীকে বিভিন্ন শাস্ত্রাদিতে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত বৈষ্ণব সিদ্ধান্ত সংগ্রহ করে বৈষ্ণব স্মৃতি-গ্রন্থ (হরিভক্তিবিলাস) সংকলনের নির্দেশ প্রদান করেন। মহাপ্রভু সনাতন গোস্বামীকে একাদিক্রমে গুরুলক্ষণ, শিষ্যলক্ষণ, বিভিন্ন মন্ত্রাদির বর্ণনা, বিভিন্ন উপাচারে শ্রীবিগ্রহ অর্চন, শ্রীমূর্তি লক্ষণ, শালগ্রাম, ভক্তির বিভিন্ন অঙ্গাদির বর্ণনা প্রভৃতি কতিপয় দিকমাত্র উল্লেখ করেন। সেসব বিষয় শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থের মধ্যলীলা ২৪তম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে।
এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, “শ্রীকৃষ্ণ এবং গুরুপরম্পরার আশীর্বাদ ব্যতীত পারমার্থিক বিষয়ে লেখা যায় না। মহাজনদের আশীর্বাদের প্রভাবেই সেই কার্য সম্পাদন করার যোগ্যতা অর্জন করা যায়।”
মাহপ্রভুর আশীর্বাদপুষ্ট নির্দেশে পরবর্তীতে শ্রীল সনাতন গোস্বামীপাদ বিভিন্ন শাস্ত্র-উদ্বৃতিসহ শ্রীহরিভক্তিবিলাস গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়া শ্রীল গোপাল ভট্র গোস্বামী নিজে ‘সৎক্রিয়াসার দীপিকা’ ও ‘সংস্কার দীপিকা’ নামক পৃথক দু’টি গ্রন্থে দশবিধ সংস্কারের বিবিধ মাঙ্গলিক ক্রিয়াদির বিধি লিপিবদ্ধ করেন। তাই পরম্পরাভুক্ত প্রামাণিক উৎসস্বরূপ গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ মূলত শ্রীপাদ সনাতন গোস্বামী কর্তৃক রচিত শ্রীহরিভক্তিবিলাস গ্রন্থ অনুযায়ী বৈষ্ণবগণ মূলত শ্রীপাদ সনাতন গোস্বামী কর্তৃক রচিত শ্রীহরিভক্তিবিলাস গ্রন্থ অনুযায়ী বৈষ্ণবাচার পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
উপরিউক্ত স্মৃতি গ্রন্থাদি রচনার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে অবৈষ্ণব-স্মৃতিলেখক বন্দ্যঘটীয় শ্রীরঘুনন্দন মহাশয় ‘অষ্টবিংশতি-তত্ত্ব’ নামক স্মৃতিপ্রবন্ধ প্রণয়ন করেন। তেমনি দেখা যায়, কমলাকর ভট্র রচিত ‘নির্ণয় সিন্ধু’, ‘ব্যবস্থাসর্বস্ব’ প্রভৃতি গ্রন্থের ব্যবস্থাপত্র। এসব গ্রন্থের ভিত্তিতেই বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ পঞ্জিকা প্রস্তুত করা হয়।যার ফলে বিভিন্ন ব্রত ও উৎসাবাদি তিথি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু এসব গ্রন্থেরও বহু পূর্বে শ্রীকৃষ্ণদেবাচার্যের ‘নৃসিংহ পরিচর্যা’, শ্রীকেশব ভট্রের ‘স্মৃতি-নিবদ্ধ’, ‘ভবদেব পদ্ধতি’ প্রভৃতি গ্রন্থ বর্তমান ছিল। আর ‘হরিভক্তিবিলাস’ গ্রন্থের কথাতো আগেই বলা হয়েছে। স্মার্তপন্থীগণ সেসব গন্থে বিধৃত সিদ্ধান্তের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন না।এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, স্মার্ত কারা? স্মার্ত মানে স্মৃতিবিৎ (যিনি স্মৃতি শাস্ত্র জানেন)। তাহলে বৈষ্ণবগণ কি স্মৃতি মানেন না? বৈষ্ণবগণ অবশ্যই স্মৃতি শাস্ত্র স্বীকার করেন।
কিন্তু পার্থক্য একটি মাত্র স্থানে। ব্যবহারকুশল স্মার্তগণ শাস্ত্র বর্ণিত বিবিধ বিধান পালন করেন নিজ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষাত্মক চতুঃবর্গ সাধনের জন্য, আর পরমার্থ কুশল বৈষ্ণবগণ কৃষ্ণ সন্তুষ্ট নিমিত্ত সকল বিধান পালন করেন নিজ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষাত্মক চতুঃবর্গ সাধনের জন্য, আর পরমার্থ কুশল বৈষ্ণবগণ কৃষ্ণ সন্তুষ্ট নিমিত্ত সকল বিধান অনুসরণ করেন।বেদান্তে প্রকৃতিবাদে কোনো পার্থক্য নেই। জীব যখন দেহে ও মনে আত্মবৃদ্ধি করতে নিজে ফলভোগীকামী হয়ে বিভিন্ন সৎক্রিয়াদি নিষ্পন্ন করে, তখন সে প্রাকৃত স্মার্ত বলে অভিহিত হয়।
তাই তাদের গ্রন্থের সাথে বৈষ্ণবস্মৃতির বিভিন্ন মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তাদের সংকলিত বিবিধ সিদ্ধান্ত পরমার্থ নিষ্ঠার শিথিলতা জ্ঞাপক। কিন্তু শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু ও গৌড়ীয় আচার্যদের অন্তর্ধানের কিয়ৎকাল পরে ক্রমান্বয়ে বৈষ্ণবস্মৃতি গ্রন্থাদি দুষ্প্রাপ্য হতে থাকে। এদিকে পরমার্থ শাস্ত্র ব্যবহারের অভাবে স্মার্তাচারই বৈষ্ণবাচারে অনধিকার প্রবেশ করতে থাকে। পরমেশ্বরজ্ঞানে বহুদেবদেবী পূজন, প্রেতশ্রাদ্ধ, বিদ্ধা একাদশী পালন প্রভৃতি বিচারে বৈষ্ণবস্মৃতির সাথে অবৈষ্ণবস্মৃতির বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়।
সেই দুরাবস্থা অপনোদনে সচ্চিদানন্দ শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বহুচেষ্টায় ‘সৎক্রিয়াসারদীপিকা’ ও ‘হরিভক্তিবিলাস’ প্রভৃতি গ্রন্থ এবং বৈষ্ণব সিদ্ধান্ত ভিত্তিক পঞ্জিকা আধুনিক যন্ত্রে মুদ্রণের ব্যবস্থা করে বৈষ্ণবস্মৃতি পুনরায় প্রচলন করতে সর্বপ্রথম উদ্যোগী হন। সেই ধারায় বর্তমানে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) শ্রী শ্রী হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থ ধৃত প্রমাণাদি বিচার সাপেক্ষ ‘বৈষ্ণব পঞ্জিকা’ প্রকাশ করে আসছ। বৈষ্ণব আচার্যের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে স্মার্তচার পালন, স্বরূপ বিস্মৃতির পরিচায়ক। তাই আত্মমঙ্গলের জন্য সকলের উচিত বৈষ্ণব স্মৃতি অনুসরণ করা।
একাদশী উপবাস দিন নির্ণয়
একাদশীর উপবাস দিন নির্ণয় প্রসঙ্গে হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে (১২/১৯৯) দুই প্রকার একাদশীর কথা বলা হয়েছে-
১. সম্পূর্ণা বা শুদ্ধা একাদশী ও
২. বিদ্ধা একাদশী
এছাড়াও অষ্টমহাদ্বাদশী ব্রতের কথাও শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। বিদ্ধা একাদশী কি এবং এরূপ একাদশী করা উচিত কি উচিত নয়, সে সম্পর্কে তিনটি মত আমরা দেখতে পাই। (ক) গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মত, (খ) নিম্বাক সম্প্রদায়ী বৈষ্ণব মত এবং (গ) স্মার্ত মত। একাদশী ব্রত উদযাপন প্রসঙ্গে প্রখানে কেবল ব্রহ্ম-মাধ্ব-গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের দর্শন তুলে ধরা হলো।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে একাদশীঃ
১ মুহুর্ত বলতে ৪৮ মিনিট বুঝায়। আর এক দন্ড বলতে ২৪ মিনিট। সুতরাং ৪ দন্ড=২ মুহুর্ত বা ৯৬ মিনিট বা ১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট। শ্রীহরিভক্তিবিলাসধৃত স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে-
সূর্যোদয়ের ১.৩৭ মি: পূর্ব পর্যন্ত সময়কে বলা হয় অরুণোদয়। ধরুন, ৫.৩৭ মি. সূর্যোদয়; এর ১.৩৬মি. পূর্বের সময় হলো ৪.০০টা, সুতরাং ৪.০০-৫.৩৭ মি.- পর্যন্ত সময় হলো অরুণোদয়। এই সময়ের মধ্যে যদি দশমী তিথি স্পর্শ করে, তবে তাকে বলা হয় দশমী বিদ্ধা একাদশী।
বিদ্ধা একাদশী বর্জন প্রসঙ্গে শাস্ত্রীয় প্রমাণ
এ প্রসঙ্গে শ্রীহরিভক্তিবিলাসধৃত গরুড় পুরাণ ও শিবরহস্যে বলা হয়েছে- ‘উদয়াৎ প্রাক যদা বিপ্র মুহুর্তদ্বয়সংযুতা। সম্পূর্ণৈকাদশী নাম তত্রৈবোপবসেদগৃহী।।(হ.ভ.বি. ১২/৩১৬)- অর্থাৎ, হে বিপ্র, সূর্যদয়ের পূর্বে দুই মুহুর্ত ( ৪৮×২=৯৬ মিনিট অর্থাৎ ১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট) ব্যাপী একাদশী থাকলে, তাকে সম্পূর্ণা একাদশী বলে। এ দিনেই উপবাস করা বিধেয়। ভবিষ্যপুরাণে বলা হয়েছে-
উপর্যুক্ত গ্রন্থসহ বিভিন্ন ঋষি এবং পুরাণ শাস্ত্রের বচন অনুসরণে এই সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবগণ কখনো অরুণোদয় বা দশমী বিদ্ধা একাদশী ব্রত পালন করেন না। শ্রীহরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে শ্রীপাদ সনাতন গোস্বামী বলেছেন, অরূণোদয়বিদ্ধা একাদশীতে উপবাস করা যায়- এভাবে যেসব বচন আছে সেগুলো অবৈষ্ণবপর বুঝতে হবে। অর্থাৎ অরুণোদয় বিদ্ধা একাদশীতে বৈষ্ণব কখনো উপবাস করবেন না। ঐসব বচন শ্রক্রমায়াকল্পিত ব্যতীত আর কিছুই নয়।
প্রচলিত পঞ্জিকাগুলোতে (যেগুলো মূলত স্মার্তমত অনুযায়ী লেখা) দশমী বিদ্ধা হলেও একাদশীর ব্যবস্থা আছে এবং পাশাপাশি পরদিন বৈষ্ণবদের জন্য একাদশীর কথা বলা হয়েছে। এজন্য যারা স্মার্ত মতে বিশ্বাসী, তারা এই বিষয়ে আজও কথাটি উল্লেখ করে থাকেন। কখনো কখনো ইসকন প্রকাশিত পঞ্জিকায় উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে বাইরের পঞ্জিকার সময়ের অমিল দেখা যায়। সেক্ষেত্রে, প্রামাণিক উৎস হিসেবে ইসকন অনুসারীগণ নিদ্বির্ধায় ইসকন প্রকাশিত পঞ্জিকা অনুযায়ীই ব্রত পালন করে থাকেন।
বিদ্ধা একাদশী পালনের ফল
শ্রীগরুড় পুরাণের পূর্বখন্ডে একাদশী মহাত্ম্য প্রসঙ্গে ১২৫ তম অধ্যায়ে বর্ণিত আছে-ব্রহ্মা বললেন, প্রাচীনকালে মান্ধাতা নামে এক রাজা ছিলেন; তিনি একাদশীতে উপবাস করার ফলস্বরূপ সসাগরা ধরার একমাত্র অধীশ্বর হয়েছিলেন; অতএব শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের একাদশীতে কেউ ভোজন করবে না। গান্ধারী দশীসংযুক্তা একাদশীতে উপবাস করেছিলেন, এজন্য গান্ধারীর শত পুত্র বিনষ্ট হয়; অতএব দশমীযুক্তা একাদশীতে অসুর সন্নিহিত থাকে, দ্বাদশীযুক্ত একাদশীতে হরি সন্নিহিত থাকেন; তবে নানাবিধ শাস্ত্রের বাক্য-বিরোধ দেখে সন্দেহ উপস্তিত হলে, অর্থাৎ একদিনেই যদি দশমী, একাদশী ও দ্বাদশীর যোগ হয়, তবে তখন দ্বাদশীতে উপবাস করে ত্রয়োদশীতে পারণ করবে।
যদি দ্বাদশী দিনে এক কলা মাত্র একাদশীও থাকে, তবুও দ্বাদশী দিনেই উপবাস করা কর্তব্য। যেদিন একাদশী, দ্বাদশী ও ত্রয়োদশী এই তিথিত্রয়ের শিশ্রণ হয়, সে দিনে উপবাস করলে সর্বপ্রকার পাপ নাশ হয়। যেদিন শুদ্ধ একাদশী থাকে, সে দিনেই উপবাস করা কর্তব্য, কিংবা দ্বাদশীযুক্ত একাদশীতেও উপবাস করতে পারে; অথবা যদি একদিন একাদশী, দ্বাদশী ও ত্রয়োদশী এই তিথিত্রয়ের মিলন হয়, তবে উপবাস করবে, কিন্তু কখনো দশমীযুক্তা একাদশীতে উপবাস করবে না। রাত্রি জাগরণ, পুরাণশ্রবণ ও গদাধরের (বিষ্ণুর) অর্চনা করে একাদশীর উপবাস করবে; রুক্মঙ্গদ রাজা এরূপ একাদশীতে উপবাস করে মোক্ষপদ পেয়েছিলেন।
মহাদ্বাদশী ব্রত
কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুদ্ধা একাদশী (বিদ্ধা নয়) ত্যাগ করেও দ্বাদশীতে একাদশী ব্রত করতে হয়। শ্রীহরিভক্তি বিলাসকার (শ্রীপাদ সনাতন গোস্বামী) অনেক শাস্ত্র পর্যালোচনা করে এরুপ কয়েকটি শুদ্ধা একাদশী ত্যাগ করে দ্বাদশীতে ব্রত করার স্থল দেখিয়েছেন। স্কন্ধ পুরাণে লিখিত আছে-
একাদশী উপবাস-দিন নির্ণয়
১. একাদশী সম্পূর্ণ হয়ে পরের দিন দ্বাদশীতে কলামাত্র বৃদ্ধি পেলে অথচ দ্বাদশীর পরের দিন বৃদ্ধি না পেলে তাকে ‘উন্মীলনী’ দ্বাদশী বলা হয়।(স্কন্দপুরাণ)। ২. সূর্যোদয় থেকে আরম্ভ করে একাদশী পূর্ণ হলে এবং দ্বাদশীও পূর্ণ হয়ে তার পরের দিন ত্রয়োদশী এরূপ মিশ্রিত তিথি হলে ত্রিস্পৃশা মহাদ্বাদশী বলে। (কূর্ম পুরাণ)। ৪. অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমা সম্পূর্ণ হয়ে প্রতিপদে কিছুমাত্র থাকলে তার পূর্বের দ্বাদশী তিথির নাম পক্ষবর্ধিনী। (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ) এই চারটি মহাদ্বাদশী কেবল তিথির ক্ষয়বৃদ্ধি অনুসারে সংঘটিত হয়।
আবার দ্বাদশীর সাথে বিশেষ বিশেষ নক্ষত্রযোগে আরো চারটি মহাদ্বাদশী ব্রতের কথা হরিভক্তিবিলাস গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। ৫. শুক্লপক্ষের দ্বাদশতে পুনর্বসু নক্ষত্র যু্ক্ত হলে তাকে সর্বোত্তমা ‘জয়া’ মহাদ্বাদশী বলা হয়। ৬. শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথিতে শ্রবণা নক্ষত্রের যোগ হলে সেই মহা পবিত্র দ্বাদশীকে ‘বিজয়া’ বলা হয়। ৭. শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথিতে রোহিণী নক্ষত্র যুক্ত হলে সেই পবিত্র দ্বাদশীকে ‘জয়ন্তী’ বলা হয়। ৮.শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথিতে পুষ্যা-নক্ষত্রের যোগ হলে সেই দ্বাদশীকে ‘পাপনাশিনী’ বলা হয়।
অর্থাৎ দ্বাদশীর সাথে পুষ্যা, শ্রবণা, পুনর্বসু এবং রোহিণী নক্ষত্রের যোগ হলে যথাক্রমে জয়া, বিজয়া, জয়ন্তী এবং পাপনাশিনী এই চারটি মহাদ্বাদশী হয়। একই গ্রন্থে বলা হয়েছে যদি দ্বাদশীর সাথে পুষ্যা, শ্রবণা, পুনর্বসু এবং রোহিণী ন্ক্ষত্রের সূর্যোদয় কাল থেকে যোগ হয় এবং ঐ সব নক্ষত্র দ্বাদশী অপেক্ষা অধিক, দ্বাদশীর সমান অথবা দ্বাদশী অপেক্ষা কম সময়কাল স্থায়ী হয়, তবে ঐ দ্বাদশীতে মহাদ্ধাদশীব্রত হবে। বিকল্পভাবে সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকে নক্ষত্র আরম্ভ হয়ে যদি দ্বাদশীর সমানকাল অথবা বেশি কাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তাহলেও মহাদ্বাদশী ব্রত হবে। এছাড়াও শ্রীহরিভক্তিবিলাস গ্রন্থ অনুযায়ী যদি একাদশী এবং দ্বাদশী শ্রবণ নক্ষত্র স্পর্শ করে তবে ঐ একাদশীর দিন উপবাস না হয়ে দ্বাদশীর দিন উপবাস হবে। অষ্টমহাদ্বাদশী বৈষ্ণবগণ কখনো পরিত্যাগ করবেন না।
পদ্ধপুরাণ ও মার্কন্ডেয়পুরাণে বলা হয়েছে যে, যারা এই দ্বাদশী ব্রতের অনুষ্ঠান করে না, দেহান্তে তারা যমপুরীতে বাস করে। তাই আত্মকল্যাণ লাভের জন্য প্রত্যেকের কর্তব্য একাদশী তথা মহাদ্বাদশী তিথিগুলো যত্ন সহকারে পালন করা। এর ফলে অবাঞ্ছিত দুঃখ-দুর্দশা থেকে পরিত্রাণ ও আত্যন্তিক মঙ্গল লাভ হয়। এছারাও হরিভক্তিবিলাসে শ্রাবণ দ্বাদশী এবং গোবিন্দ দ্বাদশী নামে আরো দুটি দ্বাদশী ব্রতের উল্লেখ রয়েছে।
জন্মাষ্টমী
জন্মাষ্টমীর ক্ষেত্রেও বিদ্ধা-অবিদ্ধা বিচার কর্তব্য। কেউ কেউ মনে করেন-“অরুণোদয় দশমীবিদ্ধা হলে একাদশী যেমন বর্জিতা হয়, তেমনি অরুণোদয়ে সপ্তমী বিদ্ধা হলে জন্মাষ্টমী ত্যাজ্যা” কিন্তু এটা সুসঙ্গত নয়। কারণ, একাদশী ছাড়া অন্য তিথিসকল সুর্যোদয়ের আরম্ভ হলে সম্পূর্ণা লক্ষণ হয়। সম্পূর্ণা তিথিতে বিদ্ধত্বারোপ মূঢ়তার পরিচয় মাত্র। গৌড়ীয় বৈষ্ণব-আচার্য প্রবর শ্রীল বলদেব বিদ্যাভূষণ প্রভু ‘প্রমেয় রত্নাবলী গ্রন্থে( ৮ম প্রমেয়-৯ শ্লোকে) স্পষ্টভাবে লিখেছেন-
শ্রীচৈতন্যমঠ ও শ্রী গৌড়ীয় মঠসমূহের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদ, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-মধ্য লীলা ২৪ পরিচ্ছেদে ৩৩৭ পয়ারের অনুভাষ্যে লিখেছেন-“একাদশীতে অরুণোদয়বিদ্ধা ত্যাগ এবং অন্য ব্রতে সুর্যোদয়বিদ্ধা ত্যাগ করে অবিদ্ধাব্রতই পালনীয়। বিদ্ধাব্রত পালনে ‘দোষ’ এবং অবিদ্ধাব্রত পালনেই ভক্তি হয়।” কেউ কেউ বলেন, পরবিদ্ধা অর্থাৎ কেবল নবমীযুক্তা অষ্টমীতেই জন্মাষ্টমীর উপবাস করতে হবে, এটাও ভ্রম।
সপ্তমীবিদ্ধা অষ্টমী পরিত্যাগ করে নবমীযুক্ত অষ্টমীতে উপবাস করতে হবে সন্ধেহ নাই, কিন্তু যে স্থলে অষ্টমীতে সপ্তমীবিদ্ধা নেই অর্থাৎ সপ্তমীতে সূর্যোদয় স্পর্শ হয়নি, সে স্থলে শুদ্ধা অষ্টমীতেই উপবাস করতে হবে। যদি অষ্টমী বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পরের দিনও কিছুকাল থাকে, তাহলে পরেরদিন অষ্টমীর শেষে পারণ করতে হবে, এই প্রকার স্পষ্ট নির্দেশ শ্রীহরিভক্তিবিলাসে আছে। সকলক্ষেত্রেই মাত্র নবমীযুক্তা অষ্টমীতে উপবাসের ব্যবস্থা থাকলে পারণের পূর্বোক্ত ব্যবস্থা হতো না। পূর্ববিদ্ধা পরিত্যাগ করে শুদ্ধা তিথিতে উপবাসই সাধারণত সর্বত্র দৃষ্ট হয়। জন্মাষ্টমী প্রসঙ্গে হরিভক্তিবিলাসে বর্ণিত আছে,-
সূর্যোদয়কালে কিঞ্চিৎমাত্র অষ্টমী থেকে সমস্ত দিনরাত্র নবমী হলে এবং তাতে বুধবার ও রোহিণী নক্ষত্রের যোগ হলে, তাকে অতি দুর্লভ জানতে হবে। হে বিভো, এরূপ যোগ শত বৎসরেও পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ।
পূর্ব দিন যদিও সোমবার কি বুধবার হয়, কিন্তু শুক্লা অষ্টমী যদি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পরদিন রোহিণীর সাথে সংযুক্ত হয়, তাহলে পরদিন নবমীযুক্তা অষ্টমীতে উপবাস করবে। কিন্তু পূর্ব ও পর উভয় দিন যদি শুদ্ধাঅষ্টমীর সাথে রোহিণী নক্ষত্রের যোগ থাকে, তাহলে যে দিন মধ্যরাত্রিতে রোহিণী থাকবে, সেই দিন উপবাস হবে। আর যদি উভয় দিনে মধ্যরাত্রিতে রোহিণী থাকে, তাহলে পূর্বদিন উপবাস হবে।