জীবনের প্রকৃত মূল্য কি? (বুদ্ধের লাল পাথরের কাহিনী)

ঘটনাটি মহাত্মা বুদ্ধের সময়কার। বুদ্ধদেব প্রায়শই আশেপাশের গ্রাম গুলোতে ভিক্ষার জন্য বের হতেন। এসময় তিনি ভিক্ষা সংগ্রহের পাশাপাশি মানুষকে জ্ঞান বিতরণ করতেন। একারনে যারা তাকে ভিক্ষা প্রদান করতেন তারা তাদের জীবনের নানাবিধ সমস্যার সমাধান ও মনের গহীনে জমে থাকা নানা প্রশ্নের উত্তর বুদ্ধদেবের কাছে জিজ্ঞাসা করতেন।

একদা পাহাড় বেষ্টিত একটি মনোরম গ্রামে ভিক্ষার উদ্দ্যেশ্যে হাজির হলেন মহাত্মা বুদ্ধ। সেখানে একটি কুটিরে গিয়ে ভিক্ষা চাইলেন বুদ্ধদেব। একটু পরেই একটি মাটির পাত্রে কিছু চাল নিয়ে কুটির থেকে বেরিয়ে এলেন এক যুবক। পাত্রের চালগুলো বুদ্ধদেবের ভিক্ষার ঝুলিতে ঢালতে ঢালতে যুবকটি প্রশ্ন করলেন, “হে মহাত্মা, আপনি তো মহাজ্ঞানী, আপনি আমাকে বলুন, মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য কি?”

বুদ্ধদেব মৃদু হেসে তার ভিক্ষার ঝুলি থেকে একটি লালচে উজ্জ্বল রঙের পাথর বের করে যুবকটির হাতে দিলেন। এরপর যুবকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তুমি এই পাথরটিকে নিয়ে বাজারে যাও, তারপর কয়েকজনের কাছে যাচাই করে পাথরটির প্রকৃত মূল্য জেনে এসো। তবে পাথরটিকে কারো কাছে বিক্রি করো না। তুমি বাজার থেকে না ফেরা পর্যন্ত আমি তোমার এই কুটিরের সামনের গাছতলায় বসে অপেক্ষা করব।”

বুদ্ধের কথামত যবকটি চলে গেলেন বাজারে। সর্বপ্রথমে যুবকটি গেলেন একজন ফল বিক্রেতার কাছে। পাথরটিকে ভালভাবে দেখে ফল বিক্রেতা বললেন “এর মূল্য ১০টি কমলালেবু”।

ফলবিক্রেতার কাছে পাথরটির মূল্য জানার পরে যুবকটি গেলেন একজন সবজি বিক্রেতার কাছে। সবজি বিক্রেতা পাথরটির মূল্য নির্ধারণ করলেন এক বস্তা আলু।

এরপর যুবকটি গেলেন এক শস্য ব্যবসায়ীর কাছে। শস্য ব্যবসায়ী পাথরটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে এর বদলে এক বস্তা শস্য দিতে রাজি হলেন।

শস্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যুবটি এবার গেলেন একজন স্বর্ণকারের কাছে। স্বর্ণকার তার আতস কাচ দিয়ে পাথরটিকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন, “এ অমূল্য পাথর তুমি কোথায় পেয়েছ? তুমি এটি আমাকে দিয়ে দাও, আমি তোমাকে পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা দেব।” যবকটি স্বর্ণকারের বলা দামে রাজি হলেন না।  তখন স্বর্ণকার বললেন, “ভাই, তাহলে পাথরটিকে আমাকে পাঁচ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রায় দিয়ে দাও অথবা তুমিই বলো এর জন্য কত দাম নেবে?”

আরও পড়ুনঃ  শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা নগরীর ইতিহাস || History of Ancient Dwarka

সবশেষে যুবকটি গেলেন এক জহুরীর কাছে। জহুরী পাথরটি দেখামাত্রই চিনে ফেললেন যে এটি একটি অতি বিরল ও মহামূল্যবান রুবি পাথর। তিনি পাথরটির সামনে একটি লাল কাপড় বিছিয়ে সেটিকে প্রদক্ষিণ করলেন এবং মাথা নত করে প্রণাম করলেন। তারপর বললেন, “ভাই, এই অমূল্য পাথরটি তুমি কোথায় পেলে? আমার মতে, সমস্ত পৃথিবী বিক্রি করে দিলেও এই পাথরের সঠিক দাম মেটানো সম্ভব নয়। এ এক অমূল্য পাথর।”

যুবকটি পাথরটির মূল্য শুনে হতবাক হয়ে গেলেন। এরপর পাথরটিকে ফেরত নিয়ে ফিরে চললেন মহাত্মা বুদ্ধের কাছে। তিনি বুদ্ধের কাছে গিয়ে বাজারের ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত মূল্যের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন।  তারপর আবার সেই একই প্রশ্ন বুদ্ধদেবকে করলেন, “প্রভু, এবার তাহলে বলুন মানুষের জীবনের মূল্য কী?”

মহাত্মা বুদ্ধ হেসে বললেন “এখনো তুমি বুঝতে পারলে না? এই ছোট্ট পাথরটির মূল্য হিসেবে ফল বিক্রেতা নির্ধারণ করলেন মাত্র ১০ টি কমলালেবু, সবজি বিক্রেতা নির্ধারণ করলেন মাত্র এক বস্তা আলু, শস্য ব্যবসায়ী নির্ধারণ করলেন মাত্র এক বস্তা দানা, স্বর্ণকার নির্ধারণ করলেন পাঁচ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা আর জহুরী একে বললেন অমূল্য। অথচ পাথর কিন্তু সেই একটাই।”

যুবকটি খেয়াল করলেন বুদ্ধদেব কথা বলা থামিয়ে মিটি মিটি হাসছেন। একটু থেমে বুদ্ধদেব আবারও বলা শুরু করলেন। “ঠিক একই অবস্থা তোমার জীবনেরও। তুমিও নিঃসন্দেহে একটি হীরা, কিন্তু মনে রেখো, সামনের ব্যক্তি তোমার মূল্য বিচার করবে তার নিজস্ব ক্ষমতা, জ্ঞান এবং উপলব্ধি অনুযায়ী।”

বুদ্ধের কথা শুনে এবার যুবকটি তার প্রশ্নের উত্তর খুজে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন জীবনের মূল্য অপরিসীম কিন্তু কিছু মানুষ তাদের জ্ঞান ও চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারনে তা উপলব্ধি করে উঠতে পারে না। তাই নিজেকে কখনো সস্তা মনে করতে নেই। যে আপনার মূল্য বোঝে না, সেখানে আপনার কোন দোষ নেই। দোষ তার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার এবং উপলব্ধির – আপনার গুণের নয়।

আরও পড়ুনঃ  দেবতাদের চেয়ে শক্তিশালী ১২ জন ভয়ংকর অসুর

 

Rate this post

Leave a Comment

error: Content is protected !!