কে আসল ঈশ্বর? ব্রহ্মা, বিষ্ণু নাকি শিব? Who is real God in Hinduism?

কে আসল ঈশ্বর, ব্রহ্মা, বিষ্ণু নাকি শিব? নাকি আদ্যাশক্তির নানা বিভূতি যেমন দুর্গা, কালী, তারা এরা ঈশ্বর? নাকি গাণপত্যের গণেশ অথবা সৌর মতের সূর্যদেবই আসল ঈশ্বর? জানি অনেকের মত আপনিও সনাতন হিন্দু ধর্মের নানাবিধ দেবতা নিয়ে তাদের অনুসারীদের মত রহস্যের অতলে ডুবে আছেন। সেইসাথে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের একক ঈশ্বরের ধারণার সাথে আমাদের বহু ঈশ্বরতত্ত্বকে মেলাতে গিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আজ বিভ্রান্ত, লজ্জিত, এবং একে অপরের শত্রুতে পরিণত হচ্ছেন। সুতারাং সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রকৃত ঈশ্বর কে তা আমাদের নিজেদের জানা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে জানানো আমাদের জন্য নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যথায় আমরা নিজেরা নিজেদের ধর্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত তো হচ্ছিই, সেইসাথে এই কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলতে থাকলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও তাদের শিকড় ভুলে অনুসরণ করবে অন্য কোন মতবাদ। তাই সনাতন হিন্দু ধর্মের আসল ঈশ্বর কে তা সঠিকভাবে জানার জন্য এই অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি একেবারে শেষ অবধি পড়ার অনুরোধ রইল।

সমগ্র সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত।

  • এরা হচ্ছেন, বৈষ্ণব- অর্থাৎ, যারা ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতারদেরকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর বলে মনে করেন এবং শুধুমাত্র তাদেরই উপাসনা করেন।
  • ২. শৈব- অর্থাৎ, যারা ভগবান শিবকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন এবং তাঁর উপাসনায় লীন থাকেন।
  • ৩. শাক্ত- অর্থাৎ, যারা দেবী আদ্যাশক্তি ও তাঁর সহচরী শক্তিদেরকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর তথা সর্বশক্তির অধিকারিনী বলে মনে করে থাকেন।
  • ৪. গাণপত্য- অর্থাৎ, যারা শ্রীগণেশের অনুসারী এবং শ্রীগণেশকে সকল প্রকার বিঘ্ননাশক ও শুভ শক্তির প্রতীক বলে মনে করে থাকেন।
  • এবং ৫. সৌর,- অর্থাৎ, যারা ভগবান শ্রী সূর্যনারায়ণের উপাসক, এবং সূর্যদেবকেই সৃষ্টির আঁধার হিসেবে মান্যতা প্রদান করে থাকেন ।

এছাড়াও কেউ বৈদিক মতে বিশ্বাসী, কেউ তন্ত্র সাধক, কেউবা শিবপুত্র কার্ত্তিকেয়র উপাসক। এগুলোর বাইরেও আজকের সনাতন সমাজ ভিন্ন ভিন্ন গুরু ও মতেরও অনুসারী। যেমন কেউ ইসকনকে অনুসরণ করেন, কেউ সৎসঙ্গের অনুসারী, কেউ শ্রীগুরুসঙ্ঘের অনুসারী, কেউ মতুয়া, আবার কেউ বা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর অনুসারী।

আরও পড়ুনঃ  পরশুরামঃ মহাকাব্যের এক অমর চরিত্র || Life History of Parshurama

অন্যদিকে আমাদের পুরাণ ও উপ-পুরাণ গুলো বিশ্লেষন করে দেখা যায়,

  • পদ্ম পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত পুরাণ, প্রভৃতি পুরাণ গ্রন্থে শ্রীবিষ্ণু ও তাঁর অবতারদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
  • শিব পুরাণ, লিঙ্গ পুরাণ, নন্দী পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায় ভগবান শিবের শ্রেষ্ঠত্ব।
  • মার্কণ্ডেয় পুরাণ, কালিকাপুরাণ, দেবীভাগবত পুরাণ থেকে জানা যায় দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়া ও তাঁর বিভূতিদের লীলা ও শ্রেষ্ঠত্বের গুণগান।
  • মুদগল পুরাণ, গণেশ পুরাণ, প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায় শ্রীগণেশের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমা।
  • সৌর পুরাণ, সাম্ব পুরাণ, প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায় শ্রী সূর্যনারায়ণের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমা।
  • এগুলো ছাড়াও ১৮টি মহাপুরাণের মধ্যে সর্ববৃহৎ পুরাণ তথা স্কন্দপুরাণে রয়েছে ভগবান শিবের পুত্র কার্ত্তিকেয়র মহিমা।

এবং এদের বাইরে শত শত বৈদিক, পৌরাণিক ও লৌকিক দেব দেবী তো রয়েছেনই।

এবার আপনিই বলুন, এত সব দেব-দেবী ও উপাস্যদের ভিড়ে কাকে আপনি সর্বোচ্চ ঈশ্বরের মর্যাদা দেবেন? আর এখান থেকেই শুরু হয়েছে সনাতনীদের মধ্যে মতবিরোধ, শত্রুতা ও বিভাজন। কেউ কেউ তো আবার অন্য দেব দেবীদেরকে নিজের উপাস্য দেবতার দাস দাসীও মনে করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা এর ঠিক উলটো। আসুন একটা উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।

ধরা যাক ৫ জন জন্মান্ধ ব্যক্তিকে আপনি একটি হাতিকে দর্শন করাতে আনলেন। এই অন্ধ ব্যক্তিরা এর আগে কখনো হাতি দেখেননি বা হাতি সম্পর্কে কোন ধারণা অর্জন করতে পারেননি। তো যেহেতু তারা চোখে দেখতে পারে না, সেহেতু তারা একটি হাতিকে স্পর্শ করে হাতি কি জিনিস তা অনুধাবন করতে লাগলেন।

  • এদের মধ্যে ১ম জন হাতির একটি পা স্পর্শ করে বললেন, “হাতি আসলে একটি মোটা স্তম্ভের মত কিছু একটা হবে।”
  • ২য় ব্যক্তি হাতির লেজ স্পর্শ করে বললেন, “ হাতি হচ্ছে মোটা দড়ি বা রশির মত কোন বস্তু হতে পারে।”
  • ৩য় ব্যক্তি হাতির পেটে স্পর্শ করে বললেন, “হাতি সম্পর্কে যেটুকু বুঝলাম তাতে মনে হচ্ছে, হাতি হচ্ছে গোলাকার গম্বুজের মত কোন বস্তু।”
  • ৪র্থ ব্যক্তি হাতির দাঁত স্পর্শ করে বললেন, “হাতি হচ্ছে একটি মসৃন লম্বাটে পাথরের মত কোন বস্তু।”
  • এবং ৫ম ব্যক্তি হাতির শুড়টিকে স্পর্শ করে বললেন, “হাতি হচ্ছে গোলাকার শরীর বিশিষ্ট সাপের মত কোন একটা কিছু।”
আরও পড়ুনঃ  মহাভারতের লক্ষ লক্ষ যোদ্ধাদের ভোজন কিভাবে প্রস্তুত করা হত? ভোজনে কখনো কম/বেশী হত না কেন?

এখন আপনিই বলুন, এই অন্ধ ব্যক্তিগণ কি হাতি সম্পর্কে ভুল কিছু বলেছেন? না, আসলে তারা সবাই সঠিক। কিন্তু বাস্তবে হাতি হচ্ছে তাদের সকলের ধারনার সমন্বিত রূপ। শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা বা উপলব্ধির সীমাবদ্ধতাই তাদেরকে হাতি সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদানে বাধ্য করেছে।

সনাতন ধর্মে ঈশ্বরের ধারণাটা অনেকটা এই হস্তীর মত। কোন ক্ষুদ্র জীবের পক্ষে ঈশ্বরের বিশালতা ও ব্যপকতা সম্পর্কে ধারণা করা একেবারেই সম্ভব নয়। মহাভারতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করার জন্য অর্জুনের যেমন দিব্যচক্ষু প্রয়োজন হয়েছিল, ঠিক তেমনভাবে অসীম ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য আমাদের এই চর্মচক্ষু বা সীমাবদ্ধ জ্ঞান যথেষ্ট নয়। ঠিক এই কারনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে ঈশ্বরের ধারনা একেক রকম। তবে বাস্তবে বিভিন্ন সম্প্রদায় যে যেভাবে ঈশ্বরকে অনুধাবন করে থাকেন প্রকৃত ঈশ্বরের স্বরূপ তাদের সেসকল ধারনার সমষ্টি বা সমন্বিত রূপ।

তাহলে প্রকৃত ঈশ্বর কে? আসলে আমাদের ঈশ্বর নিরাকার, নির্গুণ পরম ব্রহ্ম। তিনি সর্বব্যাপী, সর্বত্র এবং আকার বিহীন। তবে সৃষ্টির কল্যানে তিনি তাঁর সাকার গুণগুলো প্রকাশ করে থাকেন। যেমন সৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি ব্রহ্মা, সৃষ্টির পালনকর্তা হিসেবে বিষ্ণু, সৃষ্টির সংহারের প্রয়োজনে তিনি শিব। আবার তিনি শক্তির বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে ভক্তদেরকে শক্তি দান করেন, দেবী সরস্বতীর রূপে বিদ্যা, বুদ্ধি, কলা দান করেন আবার লক্ষ্মী রূপ ধারণ করে আমাদেরকে শ্রীবৃদ্ধি দান করে থাকেন।

সুতারাং সনাতন ধর্মের দেব-দেবী বা উপাস্যদের মধ্যে ছোট বড় নির্ণয় করা বা নিজের উপাস্যকে বড় করে দেখানোর জন্য অন্যের উপাস্যকে তাঁর দাস-দাসী বানিয়ে দেওয়া, এসব নিতান্তই মূর্খতা বা নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ। এবং নিজেদের মধ্যকার এসকল কাঁদা ছোড়াছুড়ি থেকেই জন্ম নেয় বিভাজন, মতবিরোধ এবং ধর্মান্তরের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বাস্তবে সমস্ত দেব দেবীই সেই নিরাকার পরম ব্রহ্মের গুণবাচক প্রকাশ যারা ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আবির্ভূত হয়ে থাকেন। তাই আপনি যে দেবতার উপাসকই হন না কেন, আপনি আসলে ঈশ্বরের একটি গুণবাচক প্রকাশকে উপাসনা করে সেই নিরাকার পরম ব্রহ্মেরই উপাসনা করছেন।

আরও পড়ুনঃ  চিত্রগুপ্তের জন্ম কিভাবে হয়েছিল? তিনি কিভাবে যমরাজের সহকারী হয়েছিলেন? Story of Chitragupta.

Rate this post

Leave a Comment

error: Content is protected !!