শ্রীহনুমানকে সিঁদুর দান কেন করা হয়? আর কেনই বা শ্রীহনুমানকে সিঁদুর অর্পণ করলে ভক্তের সমস্ত মনোকামনা পূর্ণ হয়? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে ভক্ত তুলসীদাস রচিত শ্রীরামচরিতমানস বা তুলসী রামায়ণের একটি কাহিনীতে।
আপনারা জানেন পবনপুত্র হনুমান ছিলেন স্বয়ং ভগবান শিবের ভক্ত অবতার যিনি শ্রীরামচন্দ্রকে তার প্রভু ও মাতা সীতাকে তার মাতার স্থান দিয়েছিলেন। তো একদিকে শ্রীহনুমান পুরুষ দেবতা অন্যদিকে তিনি ছিলেন ব্রহ্মচারী। তাহলে তাকে সিঁদুর দেওয়ার দরকারটা কি?
তুলসী রামায়ণ থেকে জানা যায়, লঙ্কা বিজয়ের পরে শ্রীরামচন্দ্র ও মাতা সীতার সাথে অযোধ্যায় এসেছিলেন শ্রীহনুমান। সেখানে কিছুদিন থাকার পরে মাতা সীতার সিথিতে টকটকে লাল রঙের সিঁদুরের দিকে নজর পড়ে শ্রীহনুমানের। মাতা সীতাকে সিঁদুর পরিধান করতে এর আগেও হয়ত দেখেছেন তিনি। তবে অযোধ্যায় ফেরার পরে সিঁদুর পরিধানের বিষয়টি নিয়ে শিশুসুলভ কৌতূহল জাগে শ্রী বজরংবলির মনে।
তো একদা মাতা সীতা সদ্য স্নান সেরে যখন শৃঙ্গার করছিলেন, ঠিক তখনই সেখানে হাজির হনুমান। মাতা সীতা হনুমানকে ডেকে বললেন, “কি ব্যাপার পুত্র? তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে নিশ্চই নতুন কোন কৌতূহল নিয়ে আমার কাছে এসেছো। ”
শ্রীহনুমান বললেন, “ ঠিকই ধরেছেন মাতা। আমি সম্প্রতি লক্ষ্য করেছি আপনি আপনার কপালে ও সিথিতে লাল রঙের কোন এক বস্তুর প্রলেপ প্রদান করেন। অনুগ্রহ করে এই লাল পদার্থের প্রলেপের মহিমা আমাকে বর্ণনা করুন। ”
উত্তরে মাতা সীতা মৃদু হেসে বললেন, “তুমি নিতান্তই ছেলেমানুষ হনুমান। তাই এই অতি সাধারন বিষয়টিও তুমি আমার কাছে জিজ্ঞাসা করছো। তুমি আমার কপালে ও সিথিতে যে লাল প্রলেপটি দেখতে পাচ্ছ, সেটি হচ্ছে সিঁদুর। আমি আমার স্বামী শ্রীরামচন্দ্রের মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু কামনায় এই বস্তু পরিধান করি। ”
মাতা সীতার কথা শুনে এক অদ্ভূত পরিতৃপ্তিতে ভরে গেল শ্রীহনুমানের চোখ-মুখ। যেন মাতা সীতার কথা শুনে নতুন কোন চমকপ্রদ পরিকল্পনার কথা মাথায় খেলে গেল তার। তবে মাতা সীতা শ্রীহনুমানের পরিকল্পনার কথা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারলেন না।
যাইহোক, পরদিন সকালে ভরা রাজসভায় মন্ত্রীপরিষদ নিয়ে রাজকার্য পরিচালনা শুরু করলেন শ্রীরামচন্দ্র। অত্যন্ত ব্যাস্ততম সেই সভায় হঠাৎ করেই শুরু হল হাসির রোল। দেখা গেল, শ্রীহনুমান তার সারা শরীরে সিঁদুর মেখে টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করে হাজির হয়েছেন অযোধ্যার রাজসভায়। শ্রীহনুমানের এই শিশুসুলভ কার্যকলাপ দেখে মনে মনে পুলকিত হলেন স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্রও। তিনি নিজেকে সংবরণ করে মৃদু স্বরে শ্রীহনুমানকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মিত্র, তোমার সারা শরীর লাল হলো কিভাবে?”
উত্তরে শ্রীহনুমান যা বললেন, তাতে হাস্যরত সভাসদদের হাসি থেমে গিয়ে জল চলে এল সকলের চোখে। হনুমান বললেন, “প্রভু, আমি গতকাল মাতা সীতাকে এই সিঁদুর তার কপাল ও সিথিতে পরিধান করতে দেখেছি। মাতা সীতা আমাকে বলেছেন যে, তিনি আপনার মঙ্গল ও দীর্ঘ আয়ুর জন্য এই রঞ্জক পরিধান করেন। প্রভু, আমিও মাতা সীতার মত আপনার মঙ্গল চাই। তবে আমি আপনার দীর্ঘ আয়ু চাই না, আমি চাই আপনার অমরত্ব। তাই আমি আমার সারা শরীর এই সিঁদুর দ্বারা রঞ্জিত করেছি।”
শ্রীহনুমানের এই শিশুসুলভ ছেলেমানুষি দেখে চোখে জল চলে এল জগতের প্রতিপালকেরও। তিনি সিংহাসন থেকে নেমে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন শ্রীহনুমানকে। এরপর বললেন, “হে মিত্র, তোমার এই ভালোবাসাই আমাকে অমর করে রাখবে। পৃথিবীতে যখন যখন রাম নাম উচ্চারিত হবে, তার পাশাপাশি শ্রী হনুমানের নামও পরম ভক্তির সাথে উচ্চারিত হবে। আজ তুমি আমার প্রতি যে অপ্রতুল ভক্তি ও প্রেম প্রদর্শন করলে তার জন্য আমি তোমাকে আশির্বাদ করছি- যে ব্যক্তি তোমাকে ভক্তির সাথে সিঁদুর অর্পণ করবে, তার সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ হবে। ”
আমাদের পৌরাণিক শাস্ত্র অনুসারে শ্রীহনুমান অষ্ট চিরঞ্জীবীদের মধ্যে অন্যতম। অর্থাৎ শ্রীহনুমান আজও আমাদের মধ্যেই বর্তমান। আর তাই ভক্তের আকুতি সবার আগে শুনতে পান তিনি। কোনও মানুষ সততার সঙ্গে তাঁর আরাধনা করলে, বা তাকে কিছু নিবেদন করলে হনুমান তাঁকে নিরাশ করেন না। তিনি নিষ্পাপ এবং সহজ-সরল। ভগবান শিব যেমন অল্পে তুষ্ট হন, তার এই অবতারকে তুষ্ট করতে অনেক কিছুর প্রয়োজন হয় না। কেবল হনুমান চালিশা পাঠ করে সামান্য সিঁদুর অর্পণ করলেই ভক্তের সব ভয় দূর করেন হনুমানজি।