মৎস্য, কূর্ম, বরাহ আদি বিষ্ণুর দশাবতারের কথা তো আমরা সবাই জানি, কিন্তু জানেন কি দশাবতারের বাইরেও ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরও ১৪টি অবতার রয়েছে? আজ্ঞে হ্যাঁ, দশাবতার সহ ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মোট অবতারের সংখ্যা ২৪টি। আর শ্রীভগবানের এসকল অবতারের কথা বর্ণনা করা হয়েছে মহাভারত, হরিবংশ পুরাণ, ভাগবতপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ সহ বেশ কিছু মহাপুরাণ গ্রন্থে। আজ দশাবতারের বাইরের সেই ১৪ টি অবতারের সংক্ষিপ্ত কাহিনী নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি আমরা। আশা করি ভিডিয়োটির শেষ অবধি আমাদের সাথে থাকবেন এবং শ্রীভগবানের এই লীলা অবতারগুলোর মহিমা শ্রবণ করে সমৃদ্ধ হবেন। সেই সাথে, ভিডিয়োটি তথ্যপূর্ণ মনে হলে বা ভিডিয়োটি থেকে নতুন কিছু জানতে পারলে কমেন্টে একবার জয় শ্রীবিষ্ণু লিখে যাবেন।

১. মোহিনী অবতার
ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মোহিনী অবতারের অন্তত দুটি ঘটনা জানতে পারা যায় আমাদের প্রাচীন পৌরাণিক শাস্ত্র থেকে।
প্রথম কাহিনীটি হচ্ছে, একদা অমরত্ব প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে দেবতা ও অসুরগণ সম্মিলিতভাবে ক্ষীরোদ সাগরে শুরু করেছিলেন সমুদ্র মন্থন। কিন্তু অমৃত কলস উত্থিত হওয়ার পর শ্রীবিষ্ণু অনুধাবন করলেন যদি দেবতাদের পাশাপাশি অসুরেররাও এই অমৃতের ফোঁটা পান করেন তাহলে তাঁরাও দেবতাদের মত অমরত্ত্ব প্রাপ্ত হবেন। এর ফলে দেবাসুরের সংগ্রাম আরও কঠিন থেকে কঠিনতর আকার ধারণ করবে। তাই অসুরগণকে বিভ্রান্ত করতে ভগবান শ্রীবিষ্ণু ধারণ করলেন এক অপরূপ লাবন্যময়ী ও লাস্যময়ী নারীর রূপ। শ্রীবিষ্ণুর এই সম্মোহনী নারী অবতারই হচ্ছেন মোহিনী অবতার। তাঁর আবেদনময়ী কায়া ও কমনীয় ইশারায় অসুরগন এতটা বিমোহিত হলেন যে তাঁরা অমৃতের কলসের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। আর এই সুযোগে অমৃতের কলসটিকে হস্তগত করে সমস্ত দেবতাদেরকে অমৃত পান করিয়েছিলেন মোহিনী রূপী শ্রীবিষ্ণু।

মোহিনী অবতারের ২য় কাহিনীটি হচ্ছে, একদা ভগবান শিবের ক্রোধ থেকে জন্ম হয়েছিল ভষ্মাসুর নামক এক অসুরের। তিনি দীর্ঘদিন ভগবান শিবের জন্য বিভিন্ন শ্মশান থেকে ভষ্ম এনে দিতেন। ফলে তিনি ভগবান শিবের কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন যে, তিনি যার মাথায় হাত রাখবেন সেই ব্যক্তি ভষ্মে পরিণত হবে। কিন্তু বর পাওয়ার পরে দুষ্ট ভষ্মাসুর স্বয়ং শিবের মাথায় হাত রাখতে উদ্যত হলেন; যাতে তিনি ভগবান শিবকেই ভষ্ম করে দিতে পারেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ভগবান শ্রীবিষ্ণু তৎক্ষণাৎ আবির্ভূত হলেন মোহিনী রূপে। তিনি তাঁর সম্মোহনী রূপ ও লাস্যময়ী নৃত্য দ্বারা বিমোহিত করলেন ভস্মাসুরকে। ভস্মাসুরও মোহিনীকে অনুসরণ করে নৃত্যের তালে তাল মেলাতে লাগলেন মোহিনীর সাথে। এক পর্যায়ে মোহিনী তার নিজের হাত নিজের মাথায় রেখে নৃত্য করতে লাগলেন। এবং মোহিনীকে অনুসরণ করে যেইমাত্র ভস্মাসুর তার নিজের মাথায় নিজের হাত রেখে নৃত্য করতে উদ্যত হলেন, তখনই তিনি শিবের বররের প্রভাবে নিজেই ভস্ম হয়ে গেলেন।

২. হয়গ্রীব অবতার
অশ্বের মুণ্ড সংবলিত ভগবান বিষ্ণুর রূপ তাকেই বলা হয় হয়গ্রীব।
একদা মধু ও কৈটভ নামের দুই ধুরন্ধর অসুর ব্রহ্মার কাছ থেকে বেদ চুরি করে ষষ্ঠ পাতাল – রসাতলে নিয়ে যান। এসময় ভগবান ব্রহ্মা স্তুতি করে শ্রীবিষ্ণুর নিদ্রা ভঙ্গ করেন এবং বেদ গ্রন্থ উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেন। ব্রহ্মার স্তুতিতে ভগবান শ্রীবিষ্ণু এই হয়গ্রীব অবতার ধারণ করে রসাতল থেকে বেদ গ্রন্থ উদ্ধার করেন।

অন্য একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, একদা ভগবান শ্রীবিষ্ণু মাতা লক্ষ্মীকে মর্ত্ত্যধামে ঘোড়া বা ঘোটকী রূপে জন্ম নেওয়ার অভিশাপ দেন। সেই অভিশাপ অনুযায়ী, একমাত্র নারায়ণতুল্য পুত্র জন্মদান করার পরেই তিনি এই অভিশাপ থেকে পরিত্রান পাবেন। কিন্তু নারায়ণতুল্য পুত্র জন্মদান করতে হলে ঘোটকীরূপী লক্ষ্মীকে নারায়ণকেই পতিরূপে প্রাপ্ত করতে হবে। তাই মাতা লক্ষ্মীর তপস্যায় এবং ভগবান শিবের অনুগ্রহে ভগবান শ্রীবিষ্ণু হয়গ্রীব রূপে মাতা লক্ষ্মীকে বিবাহ করেন এবং তার ঔরসে নারায়ণ তুল্য পুত্র জন্মদান করার পরেই দেবী শ্রীলক্ষ্মী পুনরায় বৈকুণ্ঠ ধামে ফিরে যেতে পরেছিলেন।

আরও একটি কাহিনী থেকে জানা যায়, মধু কৈটভের সাথে যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে নিজের ধনুকের উপরে মাথা রেখে অসীম নিদ্রায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণু। এদিকে কশ্যপ মুনি ও দনুর পুত্র হয়গ্রীব অসুর দেবী মহামায়াকে তপস্যায় তুষ্ট করে বর লাভ করেছিলেন যে, তার মত অশ্বমুণ্ডধারী ব্যাতীত কেউ তাকে বধ করতে পারবে না। সুতারাং হয়গ্রীব অসুর যখন দেবীর বরে বলীয়ান হয়ে সৃষ্টিকুলকে ব্যাপক পীড়া প্রদান করা শুরু করলেন, তখন ব্রহ্মার পরামর্শে দেবতাগণ নারায়ণ যে ধনুকের উপরে শুয়ে নিদ্রামগ্ন ছিলেন সেই ধনুকের জ্যা কেটে দেন। ফলে তৎক্ষণাৎ মস্তক কর্তিত হয় নারায়ণের। এরপর এবারও ব্রহ্মার পরামর্শে একটি অশ্বের মুণ্ড স্থাপন করা হয় নারায়ণের কাধে। এবং এই অশ্বমুণ্ডধারী নারায়ণই পরবর্তীতে বধ করেন হয়গ্রীব অসুরকে।

৩. দত্তাত্রেয় অবতার
ভাগবত পুরাণ থেকে জানা যায়, ঋষি অত্রির পত্নী অনুসূয়া ছিলেন পতিব্রতা, ধর্মনিষ্ঠ এবং পুণ্যাত্মা। তো একদা দেবর্ষি নারদের মুখে দেবী অনুসূয়ার কাহিনী জানতে পেরে তাকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন ত্রিদেবী। পরিকল্পনা মোতাবেক ঋষি অত্রির অনুপস্থিতিতে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে ত্রিদেব উপস্থিত হলেন মাতা অনুসূয়ার জীর্ণ কুটিরের সামনে। মাতা অনুসূয়া যখন আগত এই তিন অতিথির সৎকার করতে চাইলেন, তখন ছদ্মবেশী ত্রিদেব বললেন, তারা একটি বিশেষ ব্রত পালন করছেন। আর তাই তাদেরকে খাদ্য পরিবেশন করতে হলে মাতা অনুসূয়াকে বিবস্ত্র অবস্থায় খাদ্য পরিবেশন করতে হবে। মাতা অনূসূয়া কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। কারন স্বামী ছাড়া অন্য কারো সম্মূখে বিবস্ত্র হওয়া পতিব্রত ধর্মের বিরুদ্ধ। আবার আগত অতিথিদের সৎকার না করা ধর্ম বিরুদ্ধ। তাই অনেক ভেবে তিনি এই ব্রাহ্মণদের মাথায় একটু জল ছিটিয়ে দিলেন। পুণ্যবতী মাতা অনুসূয়ার সেই ছেটানো জলেই তিনটি শিশুতে পরিণত হলেন ছদ্মবেশী ত্রিদেব। এরপর এই তিন শিশুকে কোলে তুলে নিজের স্তন্যপান করিয়েছিলেন মাতা অনুসূয়া। পরবর্তীতে, বর হিসেবে মাতা অনুসূয়ার গর্ভে ত্রিদেব জন্ম নিয়েছিলেন দত্তাত্রেয় রূপে।

৪. নর-নারায়ণ অবতার
একদা দম্ভোদভব নামের এক রাক্ষস সূর্যদেবকে প্রসন্ন করে সহস্র কবচের বরদান প্রাপ্ত করেছিলেন। কোন ব্যক্তি যদি এই এক হাজার কবচের একটি কবচকেও ধ্বংস করতে চায় তাহলে তাকে এক হাজার বছর তপস্যা করতে হবে। এবং যদি কোন ব্যক্তি একটি কবচ ধ্বংস করেই ফেলেন, তবুও তার মৃত্যু হবে।
তো দম্ভোদভব নামক এই রাক্ষসকে বধ করতে মহাদেবের পরামর্শে দুই অংশে বিভক্ত হয়ে অবতার ধারণ করেছিলেন শ্রীরানায়ণ। তাদের নাম হল নর ও নারায়ণ। নর-নারায়ণের মানবাত্মা হলেন নর এবং দিব্যাত্মা হলেন নারায়ণ। এরা কৈলাস পর্বতে গিয়ে প্রথমে মহাদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রের জ্ঞান প্রাপ্ত করলেন এবং তার পর দুজনেই লীন হলেন কঠোর তপস্যায়। কৈলাস পর্বতে এক দিন তপস্যা করা এক হাজার দিন তপস্যা করার সমান। এরপর নর-নারায়ণ দম্ভোদভবের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন।

নর নারয়ণের একজন দম্ভোদ্ভবের সাথে একদিন যুদ্ধ করেন, অপরজন সেদিন তপস্যা করে এক হাজার বছরের তপস্যার ফল সঞ্চয় করেন। এভাবে একটি একটি করে কবচ ধ্বংস করতে থাকলেন তারা। এবং প্রতিবার কবচ ধ্বংস করার পর যখন তাদের জীবনী শক্তি শেষ হয়ে যায় তখন একজন আরেক জন কে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রবলে বাঁচিয়ে তোলেন। এভাবে যখন সহস্র কবচের ৯৯৯ টি ধ্বংস হল, তখন দম্ভোদ্ভব পালিয়ে সূর্য দেবের আশ্রয়ে চলে গেলেন। এবং সূর্যদেব তাকে নর ও নারায়নের হাত থেকে রক্ষা করতে তার অবশিষ্ট একটি কবচ সহ দেবী কুন্তীর গর্ভে স্থাপন করে দেন! কুন্তীর সেই পুত্রই হচ্ছেন কর্ণ। আর নর নারায়ণও বাকি একটি কবচ ধংস করে দম্ভোদ্ভবকে বধ করার জন্য জন্ম নিয়েছিলেন অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ রূপে।
৫. আদিরাজ পৃথু অবতার
ভাগবত পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ ও হরিবংশ পুরাণ থেকে জানা যায়, ধ্রুব বংশের মহাযশা রাজা অঙ্গের বেন নামক একটি পুত্র সন্তান লাভ হয়। কিন্তু এমন মহান বংশের সন্তান হয়েও বেন ছিলেন এক নিষ্ঠুর, অত্যাচারী ও পাপাচারী কুলাঙ্গার। রাজা অঙ্গের পরে বেন যখন রাজা হন তখন তিনি নিজেকেই ঈশ্বর ঘোষনা করেন এবং ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত সকল প্রকার যাগ-যজ্ঞাদির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। রাজা বেনের রাজ্যে ব্যাভিচার, অত্যাচার, দুঃশাসন ইত্যাদি হয়ে উঠেছিল নিত্য-নৈমত্তিক ঘটনা। ফলে পৃথিবী মাতা অন্ন, জল, বনস্পতি সহ সমস্ত ঐশ্বরিক অনুগ্রহ বন্ধ করে দিলেন। এতে চারিদিকে হাহাকার ও দুর্ভিক্ষের মাত্রা একেবারে চরমে পৌছে গেল। এসময় ঋষিগণ এই দুঃশাসন থেকে সৃষ্টিকে বাচাতে তৃণফলা দ্বারা বেনকে বধ করলেন। তবে বেনের মাতা সুনীতার অনুরোধে ঋষিগণ বেনের মৃত শরীরকে মন্ত্রঃপূত তৈল দ্বারা সংরক্ষণ করেন।
এদিকে নিঃসন্তান বেনের মৃত্যুর পর রাজাহীন হয়ে পড়ে গোটা রাজ্য। ফলে চুরি, ডাকাতি সহ সকল প্রকার হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড অহরহ ঘটতে থাকে রাজ্যে। এসময় ঋষিগণ অনেক চিন্তাভাবনা করে বেনের সমস্ত পাপকে খর্বকায় কালো নিষাদের রূপে তার জঙ্ঘা থেকে মন্থন করেন। এরপর রাজা বেনের শরীর যখন নিষ্পাপ হয়ে যায় তখন ঋষিগণ তার বাহু মন্থন করেন। এর ফলে রাজা পৃথু ও রানী অর্চি আবির্ভূত হন। রাজা পৃথুর আবির্ভাবের সাথে সাথে অন্তরীক্ষ থেকে দৈব ধনুক, তীর ও বর্ম আবির্ভূত হয়। এছাড়াও অযোনীসম্ভবা এই রাজার শরীরেও ছিল সুদর্শন চক্র ও পদ্মের চিহ্ন। এবং এসকল সংকেত অনুধাবন করে বিজ্ঞ ঋষিগণ বুঝতে পারলেন রাজা পৃথু ও রানী অর্চি আসলে ভগবান শ্রীবিষ্ণু ও মাতা লক্ষ্মীরই অবতার।

রাজা পৃথু আবির্ভূত হওয়ার পরেই যখন রাজ্যের এই দুর্দশা দেখলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন পৃথিবী তার সমস্ত শস্য ও জল নিজের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেছে। ফলে পৃথিবীতে চলছে দুর্ভিক্ষ, অনাসৃষ্টি ও হাহাকার। তাই প্রথমেই হাতে তীর ধনুক নিয়ে গাভীরূপী পৃথিবীকে তাড়া করলেন তিনি। পৃথিবীও রাজা পৃথুর ধাওয়া থেকে বাচতে আত্মসমর্পণ করলেন। পরবর্তীতে এই গাভীরূপী পৃথিবীকে দোহন করে মানবগণ পেল আনাজ ও বনস্পতি, ঋষিগণ পেলেন বৈদিক জ্ঞান, দেবতাগণ পেলেন অমৃত ও শক্তি, অসুরগণ পেলেন মদিরা ও মায়া এবং নাগকুল পেল বিষ।
৬. হংস অবতার
একদা সনৎকুমারগণ ব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হলেন। তারা সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে প্রশ্ন করলেন, “হে ব্রহ্মদেব, অনুগ্রহ করে আমাদেরকে যোগ, বিজ্ঞান, ধর্ম, বিশুদ্ধতা ও আত্মোপলব্ধির বিষয়ে জ্ঞান দান করুন।” সেসময় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা সৃষ্টিকার্যে অত্যন্ত ব্যাস্ত সময় পার করছিলেন। তাছাড়া তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই চার ঋষি যে প্রশ্ন করেছিলেন তার উত্তর দিতে যে পর্যায়ের পাণ্ডিত্য প্রয়োজন তা একমাত্র ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ছাড়া আর কারও নেই। তাই তিনি এই ঋষিগণের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করার জন্য ভগবান বিষ্ণুর অনুকম্পা প্রার্থনা করেন। এসময় ভগবান ব্রহ্মার ডাকে সাড়া দিয়ে ভগবান বিষ্ণু আবির্ভূত হয়েছিলেন এক শুভ্র রাজহংস রূপে। এরপর হংসরূপী ভগবান শ্রীবিষ্ণু ভগবান ব্রহ্মা ও সনৎকুমাদেরকে আত্মজ্ঞান, যোগ প্রভৃতি বিষয়ে উপদেশমূলক শিক্ষা প্রদান করেন।

৭. বেদব্যাস অবতার
মহাভারতের রাজা শান্তনুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে সত্যবতী আরও একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন না সত্যবতীর পিতা ছিলেন চেদিরাজ উপরিচর ও মাতা ছিলেন মৎস্যরূপী অপ্সরা আদ্রিকা। তবে সত্যবতীকে লালন পালন করেছিলেন ধীবরদের রাজা দশরাজ। তো মাছের পেট থেকে জন্ম হওয়ার কারনে সত্যবতীর শরীরে ছিল মাছের গন্ধ, যেকারনে তাকে মৎস্যগন্ধা নামেও ডাকা হত। তো একদা পরাশর মুনির মিলন আহবানে সাড়া দেওয়ার জন্য, মহর্ষি পরাশরের তাকে তিনিটি বর প্রদান করেছিলেন, প্রথমত, সত্যবতীর শরীরের মাছের গন্ধ দূরীভূত হয়ে তার শরীর থেকে মৃগনাভির সুরভিত সুগন্ধ এক যোজন দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এবং এই সুগন্ধের কারনে তার নতুন নাম হয়েছিল যোজনগন্ধা। ২য় বর ছিল পরাশরের সাথে মিলনের পরেও সত্যবতীর কুমারীত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে। এবং তৃতীয় বরটি ছিল পরাশর মুনি ও সত্যবতীর মিলনের ফলে যে পুত্র সন্তান জন্ম নেবে তিনি হবেন স্বয়ং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার।

তো কিছুদিনের মধ্যেই যমুনার একটি দ্বীপে সত্যবতী এক কৃষ্ণকায় পুত্র সন্তান জন্ম দান করেন। গায়ের রঙ কালো হওয়ার কারনে সেই নবজাতকের নাম হয়েছিল কৃষ্ণ এবং যমুনার দ্বীপে ভূমিষ্ঠ হওয়ার কারনে তার নাম হয়েছিল দ্বৈপায়ন। এবং পরবর্তীতে তিনি বেদকে চারভাগে বিভক্ত করার কারনে তার নাম হয়েছিল বেদব্যাস। এভাবেই শ্রীবিষ্ণুর এই অবতার পরিচিত হয়েছিলেন মহর্ষি কৃষ্ণ দৈপায়ন বেদব্যাস নামে।
৮. রাজা ঋষভ অবতার
পুরাকালে মহারাজ নাভি ও মেরুদেবী নামের এক ধর্মপ্রাণ বিষ্ণুভক্ত দম্পত্তি বাস করতেন। সততা, নিষ্ঠা, ধর্ম ও প্রতিজ্ঞা পালনে দৃঢ়চিত্ত হওয়ার সত্ত্বেও এই দম্পত্তির কোন সন্তানাদি ছিল না। একদা রাজা নাভি ও তার স্ত্রী মেরুদেবী একটি সন্তান কামনায় ভক্তিভরে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে একটি যজ্ঞ সম্পাদন করেন। ভক্তের এই ভক্তিতে সন্তুষ্ট হন জগতের নাথ। তিনি সেই যজ্ঞাগ্নি থেকে স্বয়ং প্রকট হয়ে এই দম্পত্তিকে আশির্বাদ করলেন এবং বর দিলেন যে তিনি নিজে স্বয়ং তাঁদের পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করবেন।

কিছুকাল পরেই মহারাজ নাভির পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন ভগবান বিষ্ণু। নবজাতক পুত্রের অতি মনোহর রূপ এবং সুস্বাস্থ্য দেখে, মহারাজ নাভি তার নাম রেখেছিলেন ঋষভ। বলা হয় এই ঋষভদেবের পুত্র ভরতের নামানুসারেই আমাদের এই ভূখণ্ডের নাম হয়েছিল ভারত। ঋষভদেবের নয়জন যোগ্যতম পুত্রকে বলা হত নবযোগেন্দ্র। এছাড়াও তার বাকী পুত্রগণ ছিলেন জ্ঞান, গুণে পরিপূর্ণ। রাজা ঋষভদেব নিষ্ঠার সাথে রাজ্যভার পরিচালনা, নিরাসক্ত হয়ে জীবন যাপন, দুষ্টের দমন-শিষ্টের পালন, প্রভৃতি গুণে ছিলেন গুণান্বিত।
৯. কপিল মুনি অবতার
কর্দম মুনি এবং দেবহূতির পুত্র রূপে এবং মহর্ষি কপিল নামে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন ভগবান বিষ্ণুর এই অবতার। তিনি ছিলেন মহাজ্ঞানী, মহা তেজস্বী এবং তীব্র বৈরাগ্যসম্পন্ন এক বৈদিক ঋষি। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায়, সগর রাজার অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াকে চুরি করে পাতাললোকে কপিল মুনির আশ্রমে বেঁধে রেখে আসেন দেবরাজ ইন্দ্র। পরবর্তীতে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র খুঁজতে খুঁজতে যজ্ঞের ঘোড়াটিকে কপিল মুনির আশ্রমের পাশে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান। কিন্তু সেই দুর্বুদ্ধি রাজকুমারগণ ভেবে বসলেন কপিল মুনি স্বয়ং হয়ত যজ্ঞের ঘোড়া অপহরণ করেছেন। তাই তাঁরা মুনিকে চোর অপবাদ দিয়ে তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করলেন। একে তো দীর্ঘকালের তপস্যা ভঙ্গের অপরাধ তাঁর ওপর চোর অপবাদ। এতে মারাত্নকভাবে ক্রুদ্ধ হলেন কপিল মুনি, তাঁর চোখ থেকে নির্গত হল ভয়ংকর ক্রোধাগ্নি। সেই ক্রোধানলে পুড়ে ভস্মীভূত হলেন সেই ষাট হাজার রাজপুত্র। এবং পরবর্তীতে এই ষাট হাজার পিতৃব্যদেরকে মুক্তি দান করতে রাজা ভগীরথ গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়ন করেছিলেন।

১০. চতুষ্কুমার অবতার
স্বীয় লীলা ও জ্ঞান বিস্তার করার জন্য চতুষ্কুমার হিসেবে এবং ব্রহ্মার মানসপুত্র রূপে জন্ম নিয়েছিলেন ভগবান বিষ্ণু। ভগবান ব্রহ্মা আশা করেছিলেন এঁরা সৃষ্টির বিস্তারের জন্য বংশবৃদ্ধি করার কাজে মনোনিবেশ করবেন। কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর জ্ঞানশক্তির অবতার হওয়ার কারনে এঁরা জাগতিক মায়ায় আবদ্ধ না হয়ে নিষ্কাম কর্ম ও আত্মতত্ত্বে মগ্ন ছিলেন। এই চারজন কুমারের নাম ছিল সনক, সনন্দন, সনাতন, এবং সনৎকুমার। এঁরা মূলত ঋষি হলেও এঁদের শরীর ছিল পাঁচ বছরের বালকের মত কোমল ও খর্বকায়।

একদা এই চারকুমার বৈকুণ্ঠে ভগবান বিষ্ণুর দর্শনে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৈকুণ্ঠের দ্বারপাল জয় এবং বিজয় তাঁদের শিশুসুলভ চেহারা দেখে তাঁদের প্রতি কিছুটা অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন এবং বৈকুণ্ঠে প্রবেশে বাঁধা প্রদান করেন। ফলে এই চতুষ্কুমারের অভিশাপে ভগবান বিষ্ণুর শত্রু হিসেবে মর্ত্যবাস করতে হয়েছিল জয় এবং বিজয়কে। প্রথম জন্মে তাঁরা ছিলেন হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু, দ্বিতীয় জন্মে তাঁরা ছিলেন রাবণ ও কুম্ভকর্ণ এবং তৃতীয় জন্মে তাঁরা ছিলেন শিশুপাল ও দন্তবক্র। এবং এই তিন জন্মেই তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর অবতার দ্বারা বধিত হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে এসেছিলেন।
১১. নারদ মুনি অবতার
কখনো শুনেছেন কি, দেবর্ষি নারদ ও ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার! তবে অবতারের শ্রেণি অনুসারে তিনি হচ্ছেন ভগবান বিষ্ণুর শক্ত্যাবেশ অবতার। পুরাণে তিনি কখনো বার্তাবাহক, কখনো পথপ্রদর্শক, কখনো ঘটক আবার কখনো কলহসংঘটক। পুর্বজন্মে একবার গন্ধর্ব ও একবার দাসীপুত্র হওয়ার সত্ত্বেও চাতুর্মাস্য ব্রত পালনকারী পরমহংস সাধুদের সংস্পর্শে তাঁর অন্তর নিষ্কলুষ হয়। পরবর্তীতে ভগবান ব্রহ্মার মানসপুত্র হিসেবে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি।
ভগবান ব্রহ্মা চেয়েছিলেন নারদ সৃজনের ধারা ত্বরান্বিত করতে বংশবিস্তারে মনোনিবেশ করুন। কিন্তু তিনি বিষ্ণুভক্তির পথ অবলম্বন করেন এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নারায়ণ মাহাত্ম্য প্রচারে ব্রতী হন। নিজ বাহন ঢেকিতে চড়ে এবং মহতী নামক বীণা বাজিয়ে ত্রিভূবন ভ্রমণ করে থাকেন তিনি।

পৌরাণিক ইতিহাসে নারদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে, তিনি হলেন ভক্তি-রস-আচার্য। তাঁর উপদেশ ছাড়া সনাতন ধর্মের প্রধান প্রধান কালজয়ী গ্রন্থগুলোর সৃষ্টি হতো না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর চার বেদকে বিভাজন, মহাভারত ও বহু পুরাণ রচনা করেও মহর্ষি বেদব্যাস যখন পরম অশান্তিতে ভুগছিলেন, তখন দেবর্ষি নারদই তাঁকে ভাগবত পুরাণ রচনার নির্দেশ দেন।
পরম ভক্ত ধ্রুব, প্রহ্লাদ, চিত্রকেতু এবং দস্যু রত্নাকরকে ভক্তিপথে দীক্ষিত করার মূল কাণ্ডারি ছিলেন দেবর্ষি নারদ। এঁদের মধ্যে রত্নাকর পরবর্তীতে মহর্ষি বাল্মীকি নাম ধারণ করে রচনা করেছেন পৃথীবীর অন্যতম বৃহত্তম মহাকাব্য রামায়ণ। এছাড়াও তিনি ভক্তি দর্শনের শ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ নারদ ভক্তি সূত্র’ এবং বৈষ্ণব উপাসনা পদ্ধতির মূল ভিত্তি নারদ পঞ্চরাত্র রচনা করেন। তিনি জগৎকে শিখিয়েছেন যে, গান, বাদ্য এবং নামকীর্তনের মাধ্যমেও পরমেশ্বরকে লাভ করা যায়।
১২. ধন্বন্তরি অবতার
সমুদ্র মন্থনের সময় আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরেক লীলা অবতার ধন্বন্তরি। ব্যধিরূপী শত্রুকে তিনি ধনুকের মত শর নিক্ষেপ করে শেষ করেন বলেই তার নাম ধন্বন্তরি। সমুদ্র মন্থনের একেবারে শেষ পর্যায়ে অতি সুদর্শন এবং চতুর্ভূজ এই দেবতা আবির্ভূত হয়েছিলেন দেব চিকিৎসক হিসেবে। তাঁর চার হাতে ছিল শঙ্খ, চক্র, অমৃত কলস এবং জলৌকা বা জোঁক। তবে কোন কোন গ্রন্থের বর্ণনামতে তাঁর হাতে জোঁকের পরিবর্তে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বা ভেষজ উদ্ভিদও উল্লেখ করা হয়েছে।
মানব শরীর সুস্থ না থাকলে ধর্ম আচরণ করা অসম্ভব। আর তাই সৃষ্টির পালন ও সংরক্ষণের তাগিদেই ভগবান শ্রীবিষ্ণু নিজের আরোগ্য শক্তিকে ধন্বন্তরি রূপে প্রকট করেছিলেন।

হরিবংশ পুরাণ ও বায়ু পুরাণ বলছে, কাশীরাজ দীর্ঘতপা একটি সন্তান কামনায় ধন্বন্তরির কঠোর তপস্যা করেছিলেন। এবং তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ধন্বন্তরি স্বয়ং তাঁর পুত্ররূপে মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করেন। এবং দীর্ঘতপার মৃত্যু পর কাশীর সিংহাসনে আরোহণ করে কাশীরাজ ধন্বন্তরি বা দিবোদাস নামে জগতে প্রসিদ্ধ হন।
কাশীরাজ ধন্বন্তরি ছিলেন পরম যোগী এবং সমস্ত ব্যাধির নাশক। তিনি সমগ্র চিকিৎসা বিজ্ঞানকে আটটি ভাগে বিভক্ত করেন যা শল্য, শালাক্য, কায়চিকিৎসা, ভূতবিদ্যা, কৌমারাভৃত্য, অগদতন্ত্র, রসায়ন ও বাজীকরণ নামে পরিচিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে কাশীরাজ ধন্বন্তরির শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহর্ষি সুশ্রুত। আর ধন্বন্তরির কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান তিনি সংকলিত করেছিলেন তাঁর সুশ্রুত সংহিতা নামক গ্রন্থে। আর এই গ্রন্থের কারণেই আধুনিক শল্য চিকিৎসার জনক হিসেবে আজও স্মরণ করা হয় মহর্ষি সুশ্রুতের নাম।
১৩. যজ্ঞপুরুষ অবতার
স্বয়ম্ভুব মন্বন্তরে প্রজাপতি রুচির ঔরসে ও তাঁর স্ত্রী আকুতির গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন এক দিব্য পুরুষ। এই দিব্য পুরুষই ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর গুণাবতার যজ্ঞপুরুষ। তিনি বিবাহ করেছিলেন দেবী শ্রীলক্ষ্মীর অবতার দক্ষিণাকে। এবং যজ্ঞপুরুষ ও দক্ষিণা দম্পত্তির ঘরে জন্মেছিলেন ১২ জন মহাপরাক্রমশালী দেবতা যারা যম বা তুষিতা নামে পরিচিত ছিলেন।
সৃষ্টির প্রথম মন্বন্তরে স্বর্গলোক রক্ষা করার জন্য ভগবান বিষ্ণু ‘যজ্ঞ’ রূপ ধারণ করে স্বয়ং ইন্দ্রের পদ গ্রহণ করেন এবং স্বর্গরাজ্য পরিচালনা করেন।

সেসময় মানবজাতি এবং দেবতাদের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদানের কোনো মাধ্যম ছিল না। ভগবান বিষ্ণু এই অবতার ধারণ করে বৈদিক যজ্ঞের নিয়মাবলী ও সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করেন। যজ্ঞের মাধ্যমে মানুষ দেবতাদের উদ্দেশ্যে আহুতি দেবে এবং দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে পৃথিবীতে বৃষ্টি, অন্ন ও সমৃদ্ধি দান করবেন। এই মহাজাগতিক চক্রটি চালু করতেই তিনি স্বয়ং ‘যজ্ঞ’ রূপে আবির্ভূত হন। তাছাড়া সেসম্য অসুর ও দানবীয় শক্তির উপদ্রবে দেবতারা দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন। যজ্ঞপুরুষরূপে অবতার গ্রহণ করে ভগবান বিষ্ণু তাঁর নিজের বারো জন শক্তিশালী পুত্রদের মাধ্যমে অসুরদের দমন করেন। যজ্ঞের সাথে দক্ষিণার মিলন জগৎকে এই শিক্ষা দেয় যে, সমাজে বা ধর্মে যেকোনো শুভ কর্মই হলো ‘যজ্ঞ’। এবং সেই কর্মের সাথে ত্যাগ বা সততা তথা দক্ষিণা যুক্ত না হলে, তা থেকে কখনো শুভ ফল বা গুণের জন্ম হতে পারে না।
১৪. শেষনাগ (অনন্ত নাগ)
ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরেক অংশাবতার হচ্ছেন শেষনাগ বা অনন্ত নাগ। মহাভারতের আদিপর্ব, বিষ্ণু পুরাণ ও ভাগবত পুরাণ থেকে জানা যায়, শেষনাগ প্রজাপতি কশ্যপ এবং তাঁর পত্নী কদ্রুর জ্যেষ্ঠ পুত্র। সহস্র ফণাযুক্ত শেষনাগ তাঁর জন্মের পরেই গন্ধমাদন, বদ্রিকাশ্রম ও গোকর্ণে কঠোর তপস্যা করেন এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে ধারণ করার দায়িত্ব পান। মূলত বিজ্ঞানীরা যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা বলে থাকেন তারই মূর্ত বা প্রতীকি রূপ হচ্ছেন এই শেষনাগ, অনন্তনাগ বা সংকর্ষণ।

ভাগবত পুরাণমতে, ভগবান শ্রীবিষ্ণুর যে তামসী শক্তি অবস্থান করে, তাঁর নাম সংকর্ষণ, অনন্ত বা শেষনাগ। ভগবান শ্রীবিষ্ণু তাঁর একটি কলা বা অংশ রূপে অনন্তনাগ হিসেবে আবির্ভূত হন এবং নিজের মস্তকে সমগ্র ধরণীকে ধারণ করেন।
সুতারাং শেষনাগ হচ্ছেন পাতালে বসবাসকারী শ্রীবিষ্ণু তামসিক শক্তির রূপ, তিনি পৃথিবীকে মস্তকে ধারণ করেছেন এবং ক্ষীরোদ সমুদ্রে তিনিই ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শয্যা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও ভগবান বিষ্ণু যখন রামচন্দ্র হিসেবে মর্ত্যে এসেছেন তখন লক্ষণ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন শেষ নাগ। এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণরূপে যখন ভগবান বিষ্ণু মর্ত্যে এসেছিলেন, তখন শেষনাগ আবির্ভূত হয়েছিলেন বলরাম বা সংকর্ষণ নামে। বলা হয়, প্রলয়কালে শেষনাগের মুখ থেকে যে বিষাগ্নি নির্গত হয়, তা একাদশ রুদ্রের রূপ ধারণ করে ত্রিলোক ধ্বংস করে।