কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা বধ করেছিলেন এই ১০ যোদ্ধা

মহাভারতের যুদ্ধে ১৮ দিনে ১৮ অক্ষৌহিণী সেনা বধিত হয়েছিল কুরুক্ষেত্রের ময়দানে। কিন্তু জানেন কি এই ১৮ অক্ষৌহিণী সেনার বেশীরভাগই বধিত হয়েছিলেন মাত্র ১০ জন বীর যোদ্ধার হাতে। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই ১০ জন বীর যোদ্ধা কারা এবং তাঁদের মধ্যে কে কতজন সেনা বধ করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি দান করেছিলেন। আশা করি সম্পূর্ণ ভিডিয়ো জুড়ে আমাদের সাথেই থাকবেন এবং কমেন্টে একবার জয় শ্রীকৃষ্ণ লিখে যাবেন।

তো বোঝার সুবিধার্থে আমাদেরকে প্রথমেই জানতে হবে প্রাচীনকালের গণনা পদ্ধতি অনুসারে ১ অক্ষৌহিণী সেনা দ্বারা কতজন সৈন্যকে বোঝানো হত। আসলে এক অক্ষৌহিণী সেনায় শুধুমাত্র মানব যোদ্ধারাই থাকতেন এমনটা নয়। ২১,৮৭০টি হাতি, ২১,৮৭০টি রথ, ৬৫,৬১০টি ঘোড়া, এবং ১,০৯,৩৫০ জন পদাতিক সৈনিক মিলে সর্বমোট প্রায় ২,১৮,৭০০ জন সেনা দ্বারা গঠিত হয় এক অক্ষৌহিণী সেনা। এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষের ৭ অক্ষৌহিণী এবং কৌরবপক্ষের ১১ অক্ষৌহিণী সেনা মিলে মোট ১৮ অক্ষৌহিণী সেনাকে সরলীকৃত করলে অনুধাবন করা যায় যে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রায় ৪০ লক্ষ সেনা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এবার আসা যাক কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সর্বোচ্চ সেনা নিধনকারী ১০ জন যোদ্ধার র‍্যাঙ্কিং-এ।

১০. সাত্যকি

মহাভারতের মহাবীর যোদ্ধাদের মধ্যে অবমূল্যায়িত এক যোদ্ধার নাম সাত্যকি। পাণ্ডবপক্ষে অর্জুন ও অভিমন্যুর পরে সাত্যকিই ছিলেন পাণ্ডবপক্ষের সবচেয়ে সামর্থ্যবান ধণুর্ধর। যদুবংশীয় সাত্যকি ছিলেন অর্জুনের শিষ্য, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরম ভক্ত এবং পাণ্ডবপক্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা।

সাত্যকি
সাত্যকি

তিনি তাঁর তীব্র পরাক্রম দ্বারা দুই দুইবার মহামহিম ভীষ্মকে যুদ্ধের ময়দানে পিছু হঠতে বাধ্য করেছিলেন। যুদ্ধে অশ্বত্থমাকে তিনি এমনভাবে নাজেহাল করে ফেলেছিলেন যে, তাঁকে উদ্ধার করতে স্বয়ং গুরু দ্রোণাচার্যকে ছুটে আসতে হয়েছিল।  এবং পুত্রকে বাঁচাতে আসা দ্রোণাচার্যও আহত হয়েছিলেন সাত্যকির বাণে।  তিনি বধ করেছিলেন কৃতবর্মা, সোমদত্ত ও ভুরিশ্রবাসহ বহু কৌরবপক্ষীয় রথী মহারথীকে, যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি, চিত্রসেন, এবং কর্ণের পুত্র বৃষসেনসহ অসংখ কৌরব বীরদেরকে। এমনকি পাণ্ডব সেনাপতি ধৃষ্টদ্যুম্নকেও দ্রোণাচার্যের ভীষণ আক্রমণ থেকে প্রাণে রক্ষা করেছিলেন তিনি। আর এ সব কিছু মিলিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সাত্যকি কর্তৃক বধিত সৈন্যসংখ্যা প্রায় অর্ধ অক্ষৌহিণী।

৯. ধৃষ্টদ্যুম্ন

যজ্ঞের জাজ্বল্যমান অগ্নিশিখা থেকে উদ্ভূত ধৃষ্টদ্যুম্ন ছিলেন অগ্নির ন্যায় প্রদীপ্ত। পাণ্ডবদের শ্যালক ধৃষ্টদ্যুম্ন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছিলেন পাণ্ডবদের সেনাপতি হিসেবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি প্রদর্শন করেছিলেন অসীম সাহস, তীব্র পরাক্রম এবং অগ্নিসম আক্রোশ। যুদ্ধের একাদশ থেকে পঞ্চদশ দিন পর্যন্ত ধৃষ্টদ্যুম্ন ও তাঁর সেনারা প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আচার্য দ্রোণের তীব্র আক্রমণের সামনে। সরাসরি যজ্ঞাগ্নি থেকে উদ্ভূত দিব্য মানব হিসেবে জন্ম নেওয়ার কারনে তিনি জন্মগতভাবেই ছিলেন বহুসংখ্যক ঐশী অস্ত্রের অধিকারী। এবং এসকল দিব্যাস্ত্র কৌরব যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে রণাঙ্গন প্রকম্পিত করে তুলেছিলেন তিনি। তাছাড়া ভীমপুত্র ঘটৎকচকেও অশ্বত্থামার আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিলেন তিনি।

ধৃষ্টদ্যুম্ন
ধৃষ্টদ্যুম্ন

ধৃষ্টদ্যুম্নের হাতেই বধিত হয়েছিলেন দ্রুমসেন ও গুরু দ্রোণাচার্যের মত যোদ্ধা। এবং সব মিলিয়ে ১৮ দিনের যুদ্ধে তিনি প্রায় অর্ধ অক্ষৌহিণী কৌরব সেনা সংহার করেছিলেন।

৮. অভিমন্যু

মহাভারতের এক বিষ্ময় বালকের নাম অভিমন্যু। মহাবীর অর্জুন ও সুভদ্রার এই বীরপুত্র ছিলেন পিতার মতই মহাপরাক্রমী, অতুলনীয় ধনুর্ধর এবং প্রবল সাহসী যোদ্ধা। পাণ্ডবদের ৭ অক্ষৌহিণী সেনার মধ্যে অর্জুনের পরে অভিমন্যুই ছিলেন সবচেয়ে সামর্থ্যবান ধনুর্বিদ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রথম  ১৩তম দিন পর্যন্ত  ১৬ বছর বয়সী অভিমন্যু বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে বধ করেছিলেন অগণিত কৌরব সেনাকে। দ্রোণ, শল্য, কর্ণ, কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন, অলম্বুষ, বিকর্ণ ও চিত্রসেনের মত বাঘা বাঘা কৌরব যোদ্ধারা পর্যন্ত পর্যদুস্ত ও পরাজিত হয়েছিলেন এই কিশোরের বিক্রমের কাছে। এমনকি গুরু দ্রোণাচার্যের রচিত চক্রব্যুহ ভেদ করার দুঃসাহসও দেখিয়েছিলেন এই বালক যোদ্ধা। অগণিত যোদ্ধাকে বধ করে তিনি গুড়িয়ে দিয়েছিলেন দ্রোনাচার্যের সেনাদূর্গ। এবং যখন কোনভাবেই এই বালকের নরসংহার থামানো যাচ্ছিল না, তখন অন্যায়ভাবে পিছন দিক থেকে প্রহার করে এবং সাতজন মহারথী মিলে একযোগে তাঁকে আক্রমণ করে নির্মমভাবে বধ করা হয় তাঁকে। তবে এতটুকু বয়সের এই বালক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রদর্শন করেছিলেন তাঁর প্রবল বীরত্ব এবং পরাক্রম। এবং সামগ্রিক হিসেবে কৌরবপক্ষের প্রায় অর্ধ অক্ষৌহিণী সেনা তিনি বধ করেছিলেন তাঁর নিজের হাতে।

আরও পড়ুনঃ  শিব ও শিবলিঙ্গ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানুন|| Why Shiva is Worshiped as Linga? Mystery of Shivling
অভিমন্যু
অভিমন্যু

৭. ভীম

মহাভারতের যুদ্ধের এক অপ্রতিরোদ্ধ যোদ্ধার নাম ভীম। তাঁর শরীরে ছিল ১০ হাজার হাতির বল এবং মস্তিষ্ক ছিল উগ্র। ফলে তিনি মহাভারতের যুদ্ধের ময়দানে কি ধরণের বিভীষিকা সৃষ্টি করতে পারেন তা সহজেই অনুমেয়। সেযুগে দুর্যোধন, বকাসুর, কীচক, এবং জরাসন্ধ ছিলেন শক্তির বিবেচনায় ভীমের সমকক্ষ। এবং এই চারজনই বধিত হয়েছিলেন ভীমের হাতে। মহাভারতের অন্যান্য বীর যোদ্ধাদের মত ভীমের কাছে কোন বিধ্বংসী দিব্যাস্ত্র ছিল না। পবনদেবের দেওয়া ধনুক ও মায়সুরের দেওয়া গদাই ছিল তাঁর সম্বল। আর এগুলোর দ্বারাই কৌরবদের সর্বনাশ করে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি মূলত একজন গদা ও মল্লযোদ্ধা হলেও তাঁর ধনুর্বিদ্যার কাছেও হার মানতে হয়েছিল গুরু দ্রোণ, পিতামহ ভীষ্ম, কর্ণ, শল্য, কৃতবর্মা এবং দুর্যোধনের মত রথী – মহারথীদেরকেও। যাইহোক, ১৮ দিন ব্যাপী প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতার সাথে অগণিত শত্রুকে সংহার করেছিলেন ভীম। এবং কৌরবদের ১০০ ভ্রাতাসহ তাঁর সংহার করা মোট সৈন্যের সংখ্যা ১ অক্ষৈহিণীর বেশী ছাড়া কম হবে না।

ভীম
ভীম

৬. দ্রোণাচার্য

দ্রোণাচার্য ছিলেন ঋষি ভরদ্বাজের পুত্র, ভগবান পরশুরামের শিষ্য এবং প্রায় সকল প্রকার দিব্যাস্ত্রের জ্ঞানসম্পন্ন এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। এছাড়াও সেযুগের সামরিক কলাকৌশল, ব্যূহ রচনা প্রভৃতি বিষয়ে নিপুন ছিলেন দ্রোণাচার্য। রণাঙ্গনে তিনি ধারণ করেছিলেন এক দুর্ধর্ষ ও রক্তলোলুপ যোদ্ধার মূর্তি।  তাঁর দুর্দণ্ড প্রতাপে পাণ্ডবপক্ষের রথী মহারথীদেরও ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা সৃষ্টি হতে থাকে। ভীম, অভিমন্যু, ঘটৎকচ, ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং সাত্যকীসহ অসংখ্য পাণ্ডব বীরদেরকে পরাজিত করেছিলেন তিনি। এছাড়াও যুদ্ধের ময়দানে নানা রকমের অভিনব ব্যূহ রচনা করে পাণ্ডবদের বিপক্ষে বিপুল বিধ্বংস রচনা করেন তিনি। এমনকি সাধারন সেনাদের উপরে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেও বিপুল বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। এবং যুদ্ধের ময়দানে তাঁর হাতেই বধিত হয়েছিলেন পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ, বিরাট রাজা, ও বিরাট রাজের পুত্র ও পৌত্রগণ। এবং তাঁকে বধ করার জন্য স্বয়ং যুধিষ্ঠিরকেও মিথ্যা কথা বতে হয়েছিল। যাইহোক, মহাভারতের এই দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সব মিলিয়ে প্রায় ১ অক্ষৌহিণীর অধিক পাণ্ডব সেনা নাশ করেছিলেন।

দ্রোণাচার্য
দ্রোণাচার্য

৫. ভীষ্ম

মহারাজ শান্তনু ও দেবী গঙ্গার পুত্র ভীষ্ম ছিলেন ইচ্ছামৃত্যুর বরপ্রাপ্ত। পরশুরামের শিষ্য হওয়ার সুবাদে তিনি ছিলেন বিপুল পরিমাণ দিব্যাস্ত্রের অধিকারী। এবং যোদ্ধা হিসেবে তাঁর পরাক্রম ছিল এমন  যে, তাঁর গুরু পরশুরাম স্বয়ং তাঁকে ২১ দিন যুদ্ধ করেও পরাজিত করতে পারেননি। কুরুক্ষেত্রের ময়দানে তাঁর অপ্রতিরোধ্য প্রহার ও প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় নাজেহাল হয়ে পড়েছিল পাণ্ডব পক্ষ। তাঁর বিধ্বংসী প্রহারে প্রতিদিনঅ বধিত হত হাজার হাজার পাণ্ডব সেনা।  তাছাড়া পাণ্ডবপক্ষের বড় বড় বীর যোদ্ধারা তথা অভিমন্যু, ভীম, সাত্যকী এবং যুধিষ্ঠিরসহ বহু রথী মহারথীগণও পরাজিত হয়েছিলেন তাঁর কাছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ময়দানে তাঁর আগ্রাসন এতটাই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে তাঁকে দুই দুইবার বধ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তাই বাধ্য হয়েই কুরুক্ষেত্রকে ভীষ্মমুক্ত করতে শিখণ্ডীকে সামনে রেখে ভীষ্মকে শরশয্যায় পাঠিয়ে দেন অর্জুন। তবে যে দশ দিন ভীষ্ম কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছিলেন সেই ১০ দিনেই তিনি প্রায় ১ অক্ষৌহিণীর অধিক পাণ্ডব সেনাকে সংহার করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ  Vrindavan Dham Explained || এখনকার বৃন্দাবন ||
ভীষ্ম
ভীষ্ম

৪. ঘটৎকচ

মধ্যম পাণ্ডব ভীম ও তাঁর রাক্ষসী পত্নী হিড়িম্বার মহারথী পুত্র ছিলেন ঘটৎকচ। তিনি মহাভারতের যুদ্ধে ব্যাপক ধংসযজ্ঞ পরিচালনা করেছিলেন কৌরব পক্ষের বিরুদ্ধে। শক্তির দিক দিয়ে তিনি তাঁর পিতা ভীমসেনের থেকে কোন অংশেই কম ছিলেন না। তিনি কখনো উড়ন্ত অবস্থায়, কখনো মেঘের আড়াল থেকে এবং কখনো পাহাড়ের আড়াল থেকে বাণবর্ষন করে অগণিত কৌরব সেনাকে বধ করেছিলেন। তাঁর আক্রমণ এতটাই ভয়ংকর ও বিধ্বংসী ছিল যে ঘটৎকচের ভয়ে কৌরব শিবিরে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছিল।

ঘটৎকচ
ঘটৎকচ

যুদ্ধের ৮ম দিনে  অর্জুনপুত্র ইরাবণকে রাক্ষস অলম্বুষ বধ করলে ভ্রাতৃশোকে ফুসে উঠেছিলেন ঘতৎকচ। সেদিন তাঁর সেই তীব্র গর্জন শুনে মনে হয়েছিল যেন সহস্র বজ্রপাতে বার বার কেপে উঠছে কুরুক্ষেত্রের মাটি। ঘটৎকচ দ্বারা সৃষ্ট এই বিভীষিকা দেখে আতঙ্ককে পালাতে শুরু করেছিলেন কৌরবপক্ষের যোদ্ধারা। পরবর্তীতে মহাশক্তিশালী রাক্ষস অলম্বুষকে বধ করে তাঁর ছিন্ন মস্তক দুর্যোধনের রথের উপরে ছুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রবল পরাক্রমের কাছে পরাজিত হয়েছিল দ্রোণ, দুর্যোধন, ভগদত্ত্বসহ কৌরবপক্ষের বহু বীর যোদ্ধাগণ। কর্ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি কর্ণকে এমন প্রবল আক্রমণ করেছিলেন যে, স্বয়ং কর্ণের মত মহাবীরও দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। কর্ণের ছোঁড়া সমস্ত অস্ত্রকে তৃণসম গুরুত্বে প্রতিহত করছিলেন ঘটৎকচ। শেষমেষ আর কোন উপায় না দেখে কর্ণ অর্জুনকে বধ করার জন্য যে বাসবী শক্তি অস্ত্র বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সেটিকেই প্রয়োগ করেছিলেন ঘটৎকচকে লক্ষ্য করে। আর এতেই বধিত হয়েছিলেন মহাবীর ঘটৎকচ। তবে তাঁর মৃত্যুর সময় তাঁর শরীরের নিচে চাপা পড়েই বধিত হয় প্রায় ১ অক্ষৌহিণী সেনা। এবং সব মিলিয়ে তিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রায় ১ থেকে দেড় অক্ষৌহিণী সেনা বধ করেছিলেন।

৩. কর্ণ

দেবী কুন্তী ও সূর্যদেবের মহাবীরপুত্র ও ভগবান পরশুরামের শিষ্য ছিলেন অঙ্গরাজ কর্ণ। গুরুদেবের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভার্গবাস্ত্র, নাগাস্ত্র, ব্রহ্মাস্ত্র, ব্রহ্মশিরাস্ত্র এবং ইন্দ্রদেবের কাছ থেকে প্রাপ্ত বাসবী শক্তিসহ অসংখ্য দিব্যাস্ত্রের অধিকারী ছিলেন দানবীর কর্ণ। ভীষ্মের কারণে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রথম ১০ দিন যুদ্ধের ময়দানে অংশ না নিতে পারা এবং পরশুরামের অপভিশাপের মত কিছু ঘটনার কারনে নিজের কনিষ্ঠ ভ্রাতার হাতে তাঁকে বধিত হতে হয়েছিল বৈকি, তবে যুদ্ধের ময়দানে মাত্র ৭ দিনে তিনি যে ব্যাপক নরসংহার ও ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করেছিলেন তা আজও এক বিষ্ময়।

কর্ণ
কর্ণ

যুদ্ধের ময়দানে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ চার ভ্রাতা তথা যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল ও সহদেবকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেও পাণদণ্ড দেন নি। অর্জুনের মহাবীর শিষ্য সাত্যকিকেও পরাজয়ের স্বাদ নিতে বাধ্য করেছিলেন তিনি। তাছাড়াও ভীমের পুত্র ঘটৎকচকে বধ করেও কৌরব শিবিরে স্বস্তি এনে দিয়েছিলেন তিনি। কর্ণপর্বে জিশ্ণু, জিশ্ণুকর্মণ, দেবাপি, চিত্র, চিত্রাযুধ, হরি, সিংহকেতু, রোচমান ও শলভ নামের নয়জন নামকরা বীরও নিহত হয়েছিলেন কর্ণের হাতে। তবে এগুলোর বাইরেও মহাশক্তিশালী ভার্গবাস্ত্র প্রয়োগ করে লক্ষ লক্ষ পাণ্ডব সেনার প্রাণ সংহার করেছিলেন কর্ণ। এবং সর্বোমোট হিসেবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আনুমানিক দেড় থেকে দুই  অক্ষৌহিণী পাণ্ডব সেনা বধ করেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ  উলুধ্বনি কেন করা হয়?

২. অশ্বত্থামা

মহাভারতের এক নপিশাচের নাম অশ্বত্থামা। গুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র হয়েও তিনি ছিলেন বিবেক, নৈতিকতা, মানবতা এবং সহানুভূতি বর্জিত এক পাষণ্ড নরাধম। তিনি দিব্যাস্ত্র ধারনের জন্য কোনভাবেই যোগ্য না হলেও গুরু দ্রোণাচার্য সন্তানের প্রতি অন্ধ স্নেহের বশবর্তী হয়ে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ভয়ংকর সব মারনাস্ত্র। আর সেসকল অস্ত্রজ্ঞান তিনি ব্যবহার করেছেন যুদ্ধের নিয়মের কোন তোয়াক্কা না করেই।

অশ্বত্থামা
অশ্বত্থামা

তিনি যুধিষ্ঠির, ভীম, সাত্যকী, ঘটৎকচ, এবং ধৃষ্টধ্যুম্নকে একাধিকবার পরাজিত করেছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। তাছাড়া অর্জুনের হাত থেকে অন্তত তিনবার কর্ণকে রক্ষা করেছিলেন। ঘটৎকচের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি ঘটৎকচের পুত্র এবং ১ লক্ষ সেনা বধ করেন। যুদ্ধের ১৫ তম দিনে চরম ক্রুদ্ধ অশ্বত্থামা নারায়ণাস্ত্রকে আহবান করে পাণ্ডব সেনাবাহিনীর উপর নিক্ষেপ করেছিলেন। যার ফলে অগণিত পাণ্ডব সেনা বীরগতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। একই দিনে, তিনি অগ্নিযাত্রার ডাক দিয়েছিলেন এবং পাণ্ডবদের ১ অক্ষোহিনী সৈন্য বধ করেছিলেন। অশ্বত্থামাই ছিলেন কৌরব পক্ষের সবচেয়ে বিধ্বংসী যোদ্ধা যিনি পাণ্ডবদের ২ অক্ষোহিনী সৈন্যকে এক রাত ও দিনে হত্যা করেছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পরেও গোপনে পাণ্ডব শিবিরে প্রবেশ করে ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখণ্ডীসহ সমস্ত উপপাণ্ডবদেরকে ঘুমন্ত অবস্থায় বধ করেন। এমনকি অভিমন্যু পত্নী উত্তরার গর্ভে থাকা মহারাজ পরীক্ষিতকে বধ করার জন্য উত্তরার উপরে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগও করেছিলেন তিনি। এবং কুরুক্ষেত্রের এই নরাধম যোদ্ধা সর্বসাকুল্যে প্রায় ২ থেকে ৩ অক্ষৌহিণী পাণ্ডব সেনা একাই বধ করেছিলেন।

১. অর্জুন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সর্বোচ্চ পরিমাণ শত্রুসৈন্য সংহারকারীর নাম পাণ্ডুপুত্র অর্জুন। ভগবান বিষ্ণুর নর-নারায়ণ অবতারের নরই হচ্ছেন এই অর্জুন। তিনি গুরু দ্রোণাচার্যের শিষ্য ছিলেন বটে তবে গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত দিব্যাস্ত্রের বাইরেও দেবরাজ ইন্দ্র, বরুণদেব, অগ্নিদেব, বায়ুদেব, ভগবান শিব প্রভৃতি দেবতাদের কাছ থেকে ভয়ংকর সব মারণাস্ত্রের অধিকারী হয়েছিলেন তিনি। আর খোদ ভগবান বিষ্ণু কৃষ্ণ রূপে ছিলেন তাঁর রথের সারথি এবং সংকটমোচন হনুমান ছিলেন তাঁর রথে আসীন। সুতারাং যে পরিমাণ দিব্যাস্ত্র তাঁর অস্ত্রভাণ্ডারে মজুদ ছিল তাঁর বেশীরভাগই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়েনি তাঁর।

অর্জুন
অর্জুন

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ১৮ দিন ব্যাপী গাণ্ডীব নামক এক অত্যন্ত ভারী এক ধনুক কাঁধে নিয়ে এবং আত্মীয়-আপনজনদের শোক মাথায় নিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে যুদ্ধ করেছিলেন এই মহাপরাক্রমশালী যোদ্ধা। আর এই মহাযুদ্ধে ভাগদত্ত, শ্রুতায়ু, ভীষ্ম, জয়দ্রথ, কর্ণ, সুসর্মাসহ অসংখ্য কৌরব রথী মহারথীদেরকে বধ করার পাশাপাশি তিনি দ্রোণ, দুর্যোধনসহ অসংখ্য কৌরব বীরদেরকে পরাজিত করেছিলেন অর্জুন। এবং বলাই বাহুল্য কুরুক্ষেত্রের এই মহারণে তিনি একাই ৭ থেকে ৮ অক্ষৌহিণী সেনা বধ করেছিলেন অর্জুন।

প্রিয় দর্শক, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কে কতজন সৈন্য বধ করেছিলেন তা একেবারে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ব্যাসদেব যেসকল দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন সেখান থেকে এই যোদ্ধাদের বধিত সেনাদের সংখ্যা অনুমান করা হয়েছে।

Leave a Comment