মহাভারতের পরতে পরতে এমন সব লাস্যময়ী ও কমনীয় নারী চরিত্রদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যাদের রূপলাবন্যে মুগ্ধ হয়েছে সমগ্র আর্যাবর্ত। তাদের সুডৌল দেহসৌষ্ঠব ও মহামোহিনী রূপমাধুরীর দিপ্তীতে সংযম হারিয়েছেন অতি সংযমী মানব থেকে শুরু করে মুনি-ঋষী বা দেবতারাও। কিন্তু এত সব রমণীয় চরিত্রদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ১০ সুন্দরী কারা? আর এই ১০ জনের মধ্যেই বা কে শ্রেষ্ঠতম?

প্রিয় দর্শক, চলুন তাহলে চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জেনে নেওয়া যাক মহাভারতের শ্রেষ্ঠতম ১০ জন সুন্দরী ও তাঁদের সৌন্দর্যের সারিবিন্যাস। আর হ্যাঁ, আপনার দৃষ্টিতে মহাভারতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী কারা তা কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না।
১০. দেবী গঙ্গা
দেবী গঙ্গা মহাভারতের নারী চরিত্রদের মধ্যে এক মোহসঞ্চারী রূপসী। শাস্ত্র বলছে, দেবী গঙ্গার সৌন্দর্য কোনো সাধারণ পার্থিব নারীর মতো ছিল না। তিনি ছিলেন অপার্থিব, জ্যোতির্ময়ী, এবং সম্মোহনী রূপের অধিকারিণী। তবে তাঁর প্রাণোচ্ছলতা ও চঞ্চলতা তাঁর রূপমাধুরীতে যোগ করেছিল অনন্য এক মাত্রা। একারনে স্বর্গসভায় তাঁর মোহনীয় চপলতায় মুগ্ধ হয়ে নিজের সংযম হারিয়ে তাঁর প্রতি কামাতুর দৃষ্টিপাত করেছিলেন রাজা মহাভিষ। আর এই অপরাধে দেবী গঙ্গা ও রাজা মহাভিষ দুজনকেই শাস্তি হিসেবে মর্ত্যে আগমন করতে হয়েছিল। ও হ্যাঁ, স্বর্গের সেই রাজা মহাভিষই কিন্তু জন্ম নিয়েছিলেন কুরুপাণ্ডবদের পূর্বপুরুষ রাজা শান্তনু রূপে।

মর্ত্যে এসেও মানবীরূপী গঙ্গার প্রথম দর্শনেই রাজা শান্তনু তাঁর রূপের মোহে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। গঙ্গার রূপ ও আভিজাত্য রাজাকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে, গঙ্গা শান্তনুকে বিবাহ করার জন্য যেসকল অযৌক্তিক শর্ত দিয়েছিলেন, তা তৎক্ষণাৎ মেনে নিয়েছিলেন রাজা শান্তনু।
আর নেবেনই বা না কেন? দেবী গঙ্গার শরীরের রঙ ছিল শরতের চাঁদের মতো শুভ্র ও দীপ্তিময়। তাঁর শরীর থেকে নির্গত হত শুভ্র কান্তি ও স্বর্গীয় আভা। শাস্ত্রে দেবী গঙ্গার নয়নযুগলকে বলা হয়েছে পদ্মপলাশাক্ষী, তাঁর চুল ছিল ঘন মেঘের মত কালো এবং তরঙ্গায়িত যা তাঁর পৃষ্ঠদেশে নদীর জলের মত প্রবাহমান থাকতো। আর এসকল কারনেই দেবী গঙ্গাকে রাখা হয়েছে মহাভারতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের মধ্যে ১০ম স্থানে।
৯. উলূপী
মহাভারত থেকে জানা যায় নাগরাজ কৌরব্য ও বিষবাহিনীর কন্যা ছিলেন উলূপী। এবং মহাভারতের নারী চরিত্রদের সৌন্দর্যের বিচারে এই নাগকন্যাকে রাখা হয়েছে ৯ম স্থানে। তিনি মর্ত্যের সাধারণ রমণীদের মতো কেবল কোমল রূপসী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক অসামান্যা, অলৌকিক, মোহময়ী এবং বন্য সৌন্দর্যের অধিকারিণী। শাস্ত্রে উলূপীকে চিরযৌবনা, সুডৌল ও নিখুঁত শারীরিক সুষমার অধিকারিনী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি ছিলেন প্রগাঢ় যৌবনদীপ্ত, যাঁর রূপের ছটা জলের নিচে নাগলোকেও আলো ছড়িয়ে দিত। তাঁর দীঘল কালো কেশরাশি, উন্নত নাসিকা, স্নিগ্ধ-কোমল কায়া, এবং মায়াবী এক জোড়া চোখ উলুপীকে দান করেছিল মহাভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুন্দরীর খেতাব। আর তাই শাস্ত্রে তাঁকে ভুজগোত্তমা, কামরূপিণী, পন্নগনন্দিনী প্রভৃতি বিশেষনে বিশেষায়িত করা হয়েছে।

বনবাসকালে অর্জুন যখন হরিদ্বারে গঙ্গাস্নান করতে নেমেছিলেন, তখন উলূপী তাঁর রূপের ছটায় সম্মোহিত করে অর্জুনের মত মহাবীরকে অপহরন করে নিয়ে যান পাতালপুরীতে। সেখানে তিনি অর্জুনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে একটি পুত্র প্রার্থনা করেছিলেন। এবং মাত্র এক রাতের সেই দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে তিনি অর্জুনের ঔরসে জন্মদান করেছিলেন ইরাবন নামক এক পুত্রসন্তানের।
৮. চিত্রাঙ্গদা
মহাভারতের শ্রেষ্ঠ ১০ সুন্দরী নারীর মধ্যে ৮ম স্থানে যাকে রাখা হয়েছে তিনিও পাণ্ডুপুত্র অর্জুনেরই স্ত্রী। পাতালপুরীতে নাগকন্যা উলূপীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অর্জুন প্রস্থান করেছিলেন মণিপুর রাজ্যের দিকে। তো সেখানে পৌছে অর্জুন সর্বাগ্রে রাজদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেই যেন সম্মোহিত হয়ে পড়লেন অর্জুন। কারন সমগ্র রাজপ্রাসাদ জুড়ে মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক অপরূপা রূপসী কুমারী কন্যা। তাঁর দীর্ঘ কুন্তল যেন মেঘরাশির মত চঞ্চল, কমল পদ্মের মত তাঁর হাস্য, ধনুকের মত নিখুঁতভাবে বাঁকানো অধর, হরিণীর মত পদ্মপলাশাক্ষী নেত্র। এই কুসুমশোভিত দীর্ঘদেহী নারীর রূপদর্শন করেই যেন ধরাশায়ী হয়ে গেলেন অর্জুন। তবে অসামান্যা লাস্যময়ী এই নারী তাঁর শারিরীক সৌন্দর্যের পাশাপাশি যুদ্ধবিদ্যায়ও ছিলেন নিপুণা।

যাইহোক, অর্জুন মণিপুরের রাজা চিত্রবাহনের কাছে সুন্দরী চিত্রাঙ্গদার পাণিপ্রার্থনা করেন। চিত্রবাহন অর্জুনকে শর্ত দিয়েছিলেন যে, তার কন্যা চিত্রাঙ্গদা ও অর্জুনের পুত্র যদি মণিপুরের উত্তরাধিকারী হয় তাহলেই তিনি অর্জুনকে কন্যাদান করবেন। চিত্রবাহনের সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন অর্জুন। ফলে অর্জুন ও চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন মণিপুরের রাজা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন পরবর্তীকালে।
৭. দময়ন্তী
মহাভারতের বনপর্বে ঋষি বৃহদশ্ব পাণ্ডবদের কাছে বর্ণনা করেছিলেন নল ও দময়ন্তীর অসামান্য প্রেম কাহিনী। আর সেখান থেকেই জানা যায় বিদর্ভের রাজা ভীমের কন্যা দময়ন্তীর অসামান্য রূপ সম্পর্কে।
যখন দময়ন্তীর স্বয়ংবর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তখন আর্যাবর্তের সমস্ত রাজা, রাজকুমার, বীর এবং গুণবান যুবকগণ হাজির হয়েছিলেন দময়ন্তীকে স্ত্রীরূপে প্রাপ্ত করার জন্য। এমনকি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র, যম, বরুন ও অগ্নি দেবও সেই স্বয়ংবর সভায় হাজির হয়েছিলেন দময়ন্তীকে লাভ করার জন্য। তাহলে কতটা রূপবতী ছিলেন এই দময়ন্তী?

শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দময়ন্তী ছিলেন রূপে লক্ষ্মী এবং গুণে সরস্বতীস্বরূপা। দেব, যক্ষ, ও মর্ত্যলোকেও তাঁর মত রূপসী কেউ কখনো দেখেনি। ব্যাসদেবের ভাষায়, তিনি যখন রাজসভায় প্রবেশ করতেন, তখন তাঁকে দেখে মনে হতো মেঘাচ্ছন্ন আকাশে হঠাৎ তীব্র দ্যুতিসম্পন্ন বিদ্যুৎ চমকে উঠেছে। তাঁর চোখ দুটি ছিল পদ্মপাতার মতো আয়ত এবং হরিণীর চোখের মতো চঞ্চলা ও গভীর, একারনে ব্যাসদেব তাকে ‘দীর্ঘাক্ষী’ নামেও অভিহিত করেছেন। তাঁর ছিল ঘন মেঘের মত কালো ও কুঞ্চিত কুন্তল। এছাড়াও প্রাচীন পৌরাণিক শাস্ত্রে দময়ন্তীকে কৃশাঙ্গী, তেজস্বী, মহাপবিত্র, কামদেবের অমোঘ অস্ত্র ইত্যাদি বিশেষনে বিশেষায়িত করা হয়েছে।
৬. সত্যভামা
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অষ্টমহিষীর মধ্যে অন্যতমা ছিলেন মাতা সত্যভামা। মাতা সত্যভামা এতটাই রূপবতী ছিলেন যে, মহাভারতের বাইরেও হরিবংশ পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ও ভাগবত পুরাণসহ বহু পুরাণ গ্রন্থে তাঁর মোহনীয় সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়।
শাস্ত্রমতে, মাতা সত্যভামা ছিলেন তপ্ত কাঞ্চনের মত গৌরবর্ণা এবং শুভ্রা। তাঁর স্নিগ্ধ এবং দীর্ঘ নয়নযুগল ছিল পদ্মপাতার মতো আয়ত, গভীর এবং কালো। তাঁর ওষ্ঠাধর ছিল রক্তিম আভাযুক্ত এবং হাতের নখগুলো ছিল পদ্মের পাপড়ির মতো তাম্রাভ। ষোড়ষী সত্যভামার দেহসৌষ্ঠব ও শারিরীক সুষমাকে বলা হয় ধ্রুপদী নারী সৌন্দর্যের আদর্শ একটি রূপ। তিনি ছিলেন কৃষাঙ্গী, দীর্ঘকেশী, এবং উন্নত বক্ষ ও নাসিকা সম্পন্না।

বিহাররত সত্যভামাকে দেখে মনে হতো একটি জ্বলন্ত অগ্নিশিখা পৃথিবীর বুকে মায়ার রূপ ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তাঁর স্নিগ্ধ রূপকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, আকাশের কোমল চন্দ্রকিরণ যেন স্বয়ং নারীর রূপ ধারণ করে মর্ত্যে নেমে এসেছে। তিনি যখন অলংকারে ভূষিত হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাশে দাঁড়াতেন, তখন তাঁকে পদ্মত্যাগী লক্ষ্মী নামেও অভিহিত করা হত। অর্থাৎ, স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী পদ্মফুল ত্যাগ করে মানবজাতির কল্যাণে মর্ত্যে আবির্ভূত হয়েছেন। এছাড়াও তাঁর সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনিন্দিতা, শুভাননা, চারুহাসিনী, মনস্বিনী, কোপনা, মানিনী প্রভৃতি বিশেষনে বিশেষায়িত করা হয়েছে আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে।
৫. সত্যবতী
মহাভারতের আরেক অনুপম সুন্দরীর নাম হচ্ছে সত্যবতী। তিনি ছিলেন মহারাজ শান্তনুর স্ত্রী তথা পিতামহ ভীষ্মের বিমাতা এবং হস্তিনাপুরের রাজমাতা। তাঁর অপরূপ রূপ লাবন্যের কারনে মহাভারতের শ্রেষ্ঠ ১০ সুন্দরীর তালিকায় তাঁকে রাখা হয়েছে ৫ম স্থানে। তবে সত্যবতীর সৌন্দর্য শুধুমাত্র কোমল রমনীয় চেহারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রূপবতীর সংজ্ঞা থেকে কিছুটা দূরে গিয়েই স্বর্গীয় সুন্দরীর খেতাব পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর গাত্রবর্ণ ছিল উজ্জ্বল শ্যমল বর্ণের, তাঁর গভীর এবং ঘন নয়নযুগলের জন্য তাঁকে বলা হত পদ্মপলাশাক্ষী। তাঁর ছিল দীর্ঘ কৃষ্ণকেশরাশি, সুগঠিত দেহসৌষ্ঠব, এবং হস্তিনীর ন্যায় ক্রমহ্রাসমান জঙ্ঘা। মাছের পেট থেকে জন্ম হওয়ার কারনে তাঁর শরীরে ছিল মাছের গন্ধ। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে, এই নারীর শরীরের তীব্র মাছের গন্ধ থাকার সত্ত্বেও পরাশর মুনির মত মহাতেজস্বী ঋষির সংযমকেও ভঙ্গ করে দিয়েছিল তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য। পরবর্তীতে পরাশরের বরে যখন তিনি তাঁর শরীরে এক দিব্য সুগন্ধ ধারন করেছিলেন তখন তাঁর রূপে যোগ হয়েছিল সৌন্দর্যের এক নতুন মাত্রা। এবং সেই সুগন্ধ এবং তাঁর তীব্র শারীরিক আকর্ষন সামাজিক শ্রেণির বেড়াজাল ছিন্ন করে তাঁকে এনে দিয়েছিল মহারাজ শান্তনুর মহিষীর মর্যাদা।

৪. কুন্তী
রাজা কুন্তীভোজের পালিত কন্যা, মহারাজ পাণ্ডুর প্রধান মহিষী এবং পঞ্চপাণ্ডবের মাতা কুন্তীকে রাখা হয়েছে মহাভারতের শ্রেষ্ঠ ১০ সুন্দরীদের মধ্যে ৪র্থ স্থানে। প্রাচীন শাস্ত্রগ্রন্থে কুন্তীর রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁকে বলা হয়েছে দীপ্তিময়য় এবং গৌরবর্ণা, তাঁর অক্ষিযুগলকে বলা হয়েছে হরিণটানা এবং আয়তলোচনা, তাঁর দৃষ্টিকে বলা হয়েছে স্নিগ্ধ অথচ তীক্ষ্ণ। রক্তজবার পাপড়ির মত দেবী কুন্তির ওষ্ঠধর ছিল শৈল্পিক ও রক্তিম আভাযুক্ত। সেইসাথে দীর্ঘ কায়া, অনিন্দ্যসুন্দর হাসি, ও দীর্ঘ মেঘবর্ণা কেশরাশি তাঁকে করে তুলেছিল রাজকীয় সৌন্দর্যের অধিকারিণী। দেবী কুন্তীর আরেক নাম পৃথা। তাঁর এই নাম থেকেই বোঝা যায় তিনি ক্ষীণদেহী দুর্বল নারী ছিলেন না, বরং তাঁর শারীরিক অবয়বে এক ধরনের দৃঢ়তা ও আভিজাত্য প্রকাশ পেত। অর্থাৎ শাস্ত্রের দৃষ্টিতে কুন্তী ছিলেন সাধারণ মানবীর সৌন্দর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এক বিশেষ, অভিজাত ও কমনীয় নারী।

তাঁর এই অতুল্য এবং সম্মোহনী সৌন্দর্যের কারনে রাজা কুন্তীভোজ যখন দেবী কুন্তীর স্বয়ংবরের আয়োজন করেছিলেন, তখন মহারাজ পাণ্ডুকে আর্যাবর্তের বাঘা বাঘা রাজা, রাজকুমার এবং বীরদের সাথে প্রতিযোগিতা করে কুন্তীকে প্রাপ্ত করতে হয়েছিল। বলা হয় দেবী কুন্তী ছিলেন চিরযৌবনা, শত আঘাত, অত্যাচার এবং বনবাসেও দেবী কুন্তীর রূপের দ্যুতি এবং রাজকীয় তেজ এতটুকু ম্লান হয়নি কখনো।
৩. সুভদ্রা
মহাভারতের মহাসুন্দরীদের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে যদুবংশের পরম রূপবতী কন্যা এবং স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রাকে। মহাভারত ও ভাগবত পুরাণ থেকে জানা যায়, সুভদ্রা ছিলেন সর্বাঙ্গসুন্দরী, এবং তাঁর সৌন্দর্য ছিল অনন্য, প্রাণবন্ত, অভিজাত এবং মনোহর। বলা হয় সুভদ্রার শ্রীরূপ ছিল দিব্য লাবন্য ও স্বর্গীয় আভায় পরিপূর্ণ। শাস্ত্র বলছে, দেবী সুভদ্রার শরীর ছিল তপ্ত কাঞ্চনের মত গৌরবর্ণা, দীপ্তিময়, এবং কোমলতায় পরিপূর্ণ। তাঁর প্রফুল্ল মুখমণ্ডল, রক্তিম আভাযুক্ত কপোল, হরিণীর চোখের মতো স্নিগ্ধ নয়নযুগল, ধনুসাদৃশ্য ওষ্ঠধর, উন্নত নাসিকা, স্ফটিকের মত স্বচ্ছ নখ, এবং সুডৌল দেহ সুষমা যে কোন মহা সংযমী পুরুষকেও পথভ্রষ্ট করতে পারত মুহূর্তেই। আর ঠিক এই কারনেই কঠোর সংযমী এবং বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের মত পুরুষও সুভদ্রাকে দর্শনমাত্র কামশরবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তবে শারিরীক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সুভদ্রা ছিলেন অতি তেজস্বী এবং ক্ষাত্র তেজে পরিপূর্ণ এক মহিয়সী নারী। আর একারনেই তিনি অভিমন্যুর মত পুত্রকে জন্মদান করে বীরপ্রসবিনী নামে ক্ষ্যাত হন জগতে।

২. রুক্মিণী
আজ্ঞে হ্যাঁ, দেবী শ্রীলক্ষ্মীর অবতার মাতা রুক্মিণীর কথাই বলছি যার সাথে কোন দেবী বা অপ্সরার রূপের তুলনাও চলে না। এবং তাঁর রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে হয়ত ভাষাগত বিশেষণের ভাণ্ডারও যেন শেষ হয়ে যায়। আপনারা জানেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম মদন মোহন। অর্থাৎ, যিনি কামদেব মদনকেও মোহিত করতে পারেন তিনিই শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই স্বয়ং মদন মোহন যার মনোহর এবং সম্মোহনী রূপে মোহিত হয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন মাতা রুক্মিণী।
শাস্ত্র বলছে, মাতা রুক্মিণীর রূপ ছিল অনিন্দ্যসুন্দর, দিব্য, পরম পবিত্র এবং তাঁর রূপে ছিল বৈকুণ্ঠীয় আভার সংমিশ্রণ, যা সমগ্র সৃষ্টিকে মোহিত করার ক্ষমতা রাখত। যেহেতু তিনি স্বয়ং মহালক্ষীর অবতার তাই তিনিই ছিলেন সৌন্দর্যের আদি উৎস। তাঁর তপ্তকাঞ্চনের মত কায়া থেকে বিচ্ছুরিত হত স্নিগ্ধ এবং সুবর্ণ প্রভা। তাঁর মুখমণ্ডল ছিল পূর্ণচন্দ্রের মতো সুষমামণ্ডিত। তাঁর চোখ দুটি ছিল ডালিমের দানার মতো লালচে প্রান্তযুক্ত এবং পদ্মপাপড়ির মতো দীর্ঘ। ঘন কৃষ্ণবর্ণ অলকাবলীর মত কুঞ্চিত ও সুবাসিত কেশরাশির অধিকারিণী ছিলেন মাতা রুক্মিণী। তাঁর কটিদেশ ছিল ক্ষীণ, বক্ষযুগল ছিল উন্নত, এবং তাঁর মৃদু হাসির দর্শন পেলেও যেন মোক্ষপ্রাপ্তির মত আনন্দ লাভ হত। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল কোকিলের কুজনের মতো মধুর এবং তাঁর দাঁতগুলো ছিল কুন্দ ফুলের কলির মতো শুভ্র ও সুবিন্যস্ত। আর এসকল শৈল্পিক মাধুর্যের কারনে তাঁকে ডাকা হয় মহামোহিনী নামে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, মাতা রুক্মিণীর এই সৌন্দর্যসম্ভার মোটেও কামোদ্দীপক ছিল না বরং তাঁকে দেখামাত্রই ভক্তিভাব জেগে উঠত মনে।

জানা যায়, এই বিদর্ভের রাজকুমারী রুক্মিণীর স্বয়ম্বরে যখন আর্যাবর্তের সমস্ত প্রান্তের প্রতাপশালী রাজা, যুবরাজ ও বীরশ্রেষ্ঠগণ উপস্থিত হন, তখন রুক্মিণীর রূপ দেখে তাঁরা সবাই নিজেদের চৈতন্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। শাস্ত্রে বলছে, রুক্মিণী যখন মন্দিরে যাওয়ার জন্য রাজপথ দিয়ে হাঁটছিলেন, তখন তাঁর সৌন্দর্যের ঝলকানিতে পাণিপ্রার্থী রাজন্যবর্গদের হাত থেকে খসে পড়ে যাচ্ছিল তাঁদের অস্ত্র।
১. দ্রৌপদী
শুধুমাত্র মহাভারতের যুগেই নয়, যদি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী হিসেবে কারও নাম নিতে হয় তাহলে সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, সেই নারী হচ্ছেন দ্রৌপদী। যেখানে আমাদের আজকের সমাজও কৃষ্ণবর্ণা নারীদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়, সেখানে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া এক কৃষ্ণবর্ণা-শ্যামাঙ্গিনী নারী আমাদের হৃদয়ে বাস করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী হিসেবে। কিন্তু কেন? কি এমন সৌন্দর্যের অধিকারিণী ছিলেন দ্রৌপদী যার কারনে আজও তাঁর সৌন্দর্যকে সকল মানবী, দেবী বা অপ্সরাদের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে মানা হয়? চলুন দেখে নেওয়া যাক শাস্ত্র কি বলছে। শাস্ত্রমতে, দ্রৌপদীর রূপের ছটা ছিল বজ্ররেখার মত তীক্ষ্ণ, অলৌকিক, সম্মোহক এবং কিংবদন্তীতুল্য। যজ্ঞের অগ্নি থেকে উদ্ভূতা এই নারীর শরীরে ছিল নীল পদ্মের সুঘ্রাণ যা দুই ক্রোশ দূরের মানুষকেও বিভ্রান্ত, ব্যকুল ও উন্মত্ত করে তুলতো। এছাড়াও অগ্নিসম্ভূতা হওয়ার কারনে তাঁর শরীরের বিরাজ করত স্বর্গীয় তেজ ও জাজ্বল্যমান আভা। দ্রৌপদী যখন শৃঙ্গার করে রাজসভায় প্রবেশ করতেন তখন যেন হাজারো মিটি মিটি জ্বলা প্রদীপের মাঝখানে যেন হঠাৎ করেই চন্দ্রপ্রভা বিরাজিত হত।

তবে ব্যাসদেব তাঁকে সাধারন সুন্দরীদের মত গৌরবর্ণা রূপে আঁকেন নি। তাঁর গায়ের রঙ ছিল প্রফুল্ল নীল পদ্মের পাপড়ির মত মসৃণ কৃষ্ণবর্ণের। তাঁর আঁখিযুগল ছিল পুণ্ডরীক পত্রের মত বিশাল, দীর্ঘায়িত ও আয়ত। তাঁর নয়নের কনীনিকাদ্বয় ছিল ঘন অঞ্জনবর্ণের এবং চারপাশটা ছিল ঈষৎ রক্তাভ। তাঁর ভ্রূ দুটি ছিল নিখুঁত ধনুকের মতো বাঁকানো। মেঘমালার রঙ এনে যেন রঞ্জিত করা হয়েছিল পাঞ্চালীর দীর্ঘ-কুঞ্চিত কুন্তল। তাঁর হাতের তালু এবং পায়ের নখগুলো ছিল উদীয়মান রক্তিম সূর্যের মতো তাম্রাভ আভা যুক্ত। তাঁর অঙ্গসৌষ্ঠব যেন আঁকা হয়েছিল প্রবীন শিল্পীর তুলির মসৃন আঁচড়ে। গোলাপের পাপড়ীর মত মসৃন-কোমল ওষ্ঠাধর, সুগঠিত, উন্নত ও সুডৌল বক্ষযুগল, পদ্মনাভি সাদৃশ্য নাভিদেশ, সুদৃঢ় ও উন্নত নিতম্ব, ক্ষীণ কটিদেশ, ক্রমহ্রাসমান জঙ্ঘা, এবং চারুলতার মত চাল চলন তাঁকে দান করেছে আদর্শ পদ্মিনী নারীর মহিমা। এছাড়াও তিনি ছিলেন চিরযৌবনা, সুহাসিনী এবং তীব্র তেজস্বিনী। এবং তাঁর রূপের মায়াজালে সম্মোহিত হয়ে কামার্ত দুর্যোধন, দুঃশাসন, সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ এবং মৎস্য দেশের সেনাপতি কীচক ডেকে এনেছিলেন তাঁদের চরম পরিণতি। এমনকি মহাবীর কর্ণের মত যোদ্ধাও স্ত্রীরূপে প্রাপ্ত করতে চেয়েছিলেন এই অতুলনীয় সুন্দরীকে। আর তাঁর কারনেই যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মত মহাবিধ্বংসী যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।