এই সুস্বাদু ফলগুলো খেতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই নিবন্ধটি পড়ার পর এই ফলগুলো খাওয়ার সময় এদের স্বাদ আরও বেড়ে যাবে আপনাদের কাছে। সেইসাথে, এরপর থেকে এই ফলগুলো স্পর্শ করা মাত্রই পবিত্র ভক্তিভাব জাগ্রত হবে আপনার মনে। কারণ এই ফলগুলোর সাথেই জড়িয়ে আছে প্রায় ৭০০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর দণ্ডকারণ্যে মাতা সীতা, প্রভু শ্রীরামচন্দ্র ও শ্রীলক্ষণের করুণ বনবাস জীবনের স্মৃতি। তো চলুন দর্শক শুরু করা যাক সীতাফল, রামফল, লক্ষণফল ও হনুমানফলের নামকরণের পৌরাণিক কাহিনী। তবে নিবন্ধটি থেকে নতুন কিছু জানতে পারলে কমেন্টে একবার জয় শ্রীরাম লিখে যাওয়ার অনুরোধ রইল।
১৪ বছরের বনবাস জীবনে বনের ফল ও গাছের মূলই ছিল রাম-লক্ষণ-সীতার মূল খাদ্য। কিন্তু এর মধ্যে তিনটি ফল হয়ে উঠল এই তিন বনবাসীর সবচেয়ে পছন্দের ফল। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেই ফলগুলোর বৃত্তান্ত।
১. সীতাফল (আতা)
হ্যাঁ, যাকে সীতাফল বলা হচ্ছে সেটি আমাদের কাছে আতা নামেই বেশী পরিচিত। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন হিন্দীভাষীদের মধ্যে এই ফলটিই সীতাফল নামে পরিচিত। কথিত আছে, দণ্ডকারণ্যের একটি বিশেষ মিষ্টি ফল মাতা সীতার অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠে। ফলটির বাইরের আবরণ কিছুটা অমসৃণ হলেও এর ভেতরের অংশ ছিল মাতা সীতার হৃদয়ের মতোই কোমল, স্নিগ্ধ এবং পবিত্র।
আবার অন্য একটি জনশ্রুতি অনুসারে, রাবণ যখন মাতা সীতাকে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি পুষ্পক বিমানে বসে অশ্রুপাত করছিলেন। এবং তাঁর অশ্রুর প্রুতিটি ফোঁটা যেখানে যেখানে পতিত হয়েছিলে সেই স্থানগুলোতে জন্ম হয়েছিল এই বিশেষ ফলগাছটির।
পরবর্তীকালে, মাতা সীতার প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি থেকে এই ফলের নাম হয় সীতাফল যা আমাদের বাঙালীদের কাছে আতাফল নামেই সর্বাধিক পরিচিত। তাই যারা সীতাফলের এই কাহিনীটি জানেন তাদের কাছে এর প্রতিটি কোষ যেন মাতা সীতার সেই বনবাস জীবনের কঠিন দিনগুলোর নীরব সাক্ষী।
২. রামফল (নোনা)
হ্যাঁ, এই ফলটিও আপনাদের কাছে খুবই পরিচিত। বস্তুত, আমাদের কাছে এটি নোনা ফল নামেই বেশী পরিচিত। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা এর আরেক নাম রামফল। বাহ্যিকভাবে, সীতাফলের তুলনায় এটি আকারে কিছুটা বড়, মসৃণ পৃষ্ঠযুক্ত এবং এর রং সামান্য লালচে বা গোলাপি আভাযুক্ত। তবে সীতাফল ও রামফলের ভেতরের গঠন ও স্বাদ প্রায় কাছাকাছিই বলা চলে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ফলটির নাম রামফল হলো কেন? আসলে এই ফলটির নামকরণের পিছনে রয়েছে শ্রীরামচন্দ্রের সাথে ফলটির বৈশিষ্ট্যের সামঞ্জস্যতা। আপনারা জানেন, প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের চরিত্রের বড় গুণগুলো হচ্ছে ধীর, স্থির ও দৃঢ়তা। একইভাবে রামফল অতি ধীরে বেড়ে ওঠে, পরিপক্ক হতে বেশ সময় নেয় এবং দৃঢ়ভাবে গাছের সাথে আঁকড়ে থাকে। তাই ঝড়বৃষ্টি হলেও এই ফল সহজে গাছ থেকে ঝরে পড়ে না।
বলা হয় গহীন জঙ্গলের শ্বাপদ-সংকুল পরিবেশে বিচরণ করার সময় প্রভু শ্রীরামচন্দ্র যখন ক্লান্তি বোধ করতেন তখন এই সুমিষ্ট ফলটিই তাঁর ক্ষুধা নিবারণ করত। এবং এই কারনেই পরবর্তীতে ভক্তদের কাছে এই বন্য ফলটি হয়ে ওঠে রামফল।
৩. লক্ষণফল (Soursop)
যে ফলটি দেখতে পাচ্ছেন সেটিই আসলে লক্ষণফল। সাধারণভাবে এটি কিছুটা অপ্রতুল হলেও দক্ষিণভারতে এটি বেশ সহজলভ্য। বলা হয় দণ্ডকারণ্যে বনবাস করার সময় এটিই ছিল শ্রীলক্ষণের প্রিয় খাবার। কিন্তু এমন কাঁটাযুক্ত একটি ফল কেনইবা লক্ষণের প্রয় হবে এবং এটার নামই বা কেন লক্ষণফল হবে?
এখানেও রয়েছে ফলটির সাথে শ্রীলক্ষণের চারিত্রিক সামঞ্জস্যতা। ব্যক্তিজীবনে লক্ষণ ছিলেন প্রচণ্ড তেজস্বী, ক্রোধী এবং স্বল্প মেজাজী। তবে তাঁর অন্তর ছিল কুসুমের মত কোমল এবং শ্রীভগবানের প্রতি সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত। একইভাবে, লক্ষণফলের বাইরেটা কাঁটাযুক্ত ও রুক্ষ হলেও ভিতরটা একেবারে তুলোর মত নরম এবং কোমল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লক্ষণফলের স্বাদও কিন্তু কিছুটা টক-মিষ্টি যা শ্রীলক্ষণের চরিত্রের সাথে হুবহু মিলে যায়। আর এ সবকিছু মিলিয়ে Soursop নামের এই ফলটি আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে লক্ষণফল।
৪. হনুমান ফল (Soursop)
এতক্ষণ আমরা যেটাকে লক্ষণফল নামে চিনলাম সেটিই অঞ্চলভেদে হনুমান ফল নামেও পরিচিত। তবে এর নাম হনুমান ফল হওয়ার কারন কিছুটা আলাদা। হনুমানজি যেমন লঙ্কা দহনের সময় এবং লক্ষ্মণের প্রাণ বাঁচাতে গন্ধমাদন পর্বত তুলে আনার সময় নিজের অসীম শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন, এই ফলটিকেও তেমনি এক ‘মহৌষধি’ বা শক্তিশালী ফল বলে মনে করা হয়। এর অসাধারণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং পুষ্টিগুণের কারণে রামভক্ত হনুমানের নামানুসারে ভারতের অনেক অঞ্চলে এর নাম রাখা হয়েছে ‘হনুমান ফল’।
আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, হনুমান ফলের পাতা এবং ফলে প্রচুর পরিমাণে ‘অ্যাসিটোজেনিন’ নামক যৌগ থাকে, যা ল্যাব টেস্টে ক্ষতিকর ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে বলে ধারণা করা হয়। এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস উপশম, হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহু গুণ বাড়াতে হনুমান ফল অত্যন্ত কার্যকরী বলে মনে করা হয়।
বিজ্ঞান ও পুরাণ
প্রিয় দর্শক, এবার একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যাক। এতক্ষণ আমরা যে ফলগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম, আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুসারে, সেগুলো মূলত Annona পরিবারভুক্ত। এবং বলা হয় ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগীজ নাবিকদের মাধ্যমে এগুলো ভারতবর্ষে প্রবেশ করে।
তাহলে কি রামায়ণের সাথে সম্পর্কিত এই ফলগুলোর পৌরাণিক ইতিহাস মিথ্যে হয়ে গেল? একেবারেই না! কারণ ইতিহাস আর লোকসংস্কৃতির ধারা সবসময় শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানের খাতায় লেখা থাকে না, বরং তা মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসের মাঝেও বেঁচে থাকে। আর যদি বিজ্ঞানের কথাই বলতে হয়, তবে গবেষক পুষ্কর ভাটনগরের জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা অনুযায়ী, বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান প্ল্যানেটোরিয়াম সফটওয়্যারে বসিয়ে জানা গেছে, শ্রীরামচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল ১০ জানুয়ারি, ৫১১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে! অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৭,১৪০ বছর আগে। সুতরাং, কে বলতে পারে, অতীতে হয়তো এই উদ্ভিদগুলোর অস্তিত্ব আমাদের এই অঞ্চলেই ছিল!
আশা করি, এখন থেকে আতা বা নোনা ফল খাওয়ার সময় প্রভু শ্রীরামচন্দ্র ও মাতা সীতার সেই পবিত্র স্মৃতি আপনার অবশ্যই মনে পড়বে। সেইসাথে ফলগুলোর স্বাদেও আসবে আরও পরিতৃপ্তি। লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট বক্সে একবার ভক্তিভরে ‘জয় শ্রী রাম’ লেখার অনুরোধ রইল।