সহদেব কিভাবে মহাভারতের সকল ঘটনা আগে থেকে জানতেন?

যদি বলি পঞ্চপাণ্ডবের কনিষ্ঠ পাণ্ডব সহদেব ছিলেন ত্রিকালজ্ঞ, তাহলে কি ভুল বলা হবে? আজ্ঞে না, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবকিছুই জানতেন সহদেব। এবং বলতে গেলে, সহদেব জানতেন কিভাবে দুর্যোধন ও শকুনি মিলে জতুগৃহে পাণ্ডবদেরকে পুড়িয়ে মারার চক্রান্ত করবেন, অঙ্গরাজ কর্ণের আসল পরিচয় কি, দ্রৌপদীর সয়ম্বর সভায় কি ধরণের সংকট উপস্থিত হবে, মাতা কুন্তীর অসতর্ক আদেশে কিভাবে দ্রৌপদী পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী হবেন, ষড়যন্ত্রমূলক পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির কিভাবে তাঁর সর্বস্ব হারাবেন, কিভাবে ভরা রাজসভায় একবস্ত্রা, রজঃস্বলা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করা হবে, কি কারনে পাণ্ডবদেরকে ১২ বছর বনবাস এবং ১ বছর অজ্ঞাতবাসে থাকতে হবে, কুরুক্ষেত্রের ১৮ দিনের যুদ্ধে কিভাবে আর্যাবর্ত প্রায় পুরুষশূন্য হবে, কিভাবে নিজের পুত্র, ভ্রাতুষ্পুত্র, পৌত্র, পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্যসহ অসংখ্য স্বজনের মৃত্যু নিজে চোখে দেখতে হবে তাঁদেরকে। কিন্তু প্রশ্ন হল এই ত্রিকালজ্ঞ হওয়ার জ্ঞান তিনি কোথায় পেলেন? এবং যদি তিনি আগে থেকেই সবকিছু জানতেন তাহলে তা প্রকাশ করলেন না কেন? প্রিয় দর্শক, মহাভারতের এই অজানা কাহিনীতে আপনাকে স্বাগতম। আশা করি ভিডিয়োটি সম্পূর্ণ দেখবেন এবং ভিডিয়োটি থেকে যদি নতুন কিছু জানতে পারেন তাহলে কমেন্টে একবার জয় শ্রীকৃষ্ণ লিখে যাবেন।

আপনারা জানেন, একদা মহারাজ পাণ্ডু মৃগয়া করতে গিয়ে সঙ্গমরত এক হরিণযুগলের উপরে তীরবর্ষন করে তাঁদেরকে বধ করেন। কিন্তু বাস্তবে এই হরিণযুগল ছিলেন কিন্দম মুনি ও স্ত্রী। তাঁরা হরিনের ছদ্মবেশে সঙ্গমে রত ছিলেন। তো মহারাজ পাণ্ডুর ছোঁড়া তীরের আঘাতে যখন তাঁদের মৃত্যু আসন্ন, তখন কিন্দম মুনি এক ভয়ংকর অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিলেন মহারাজ পাণ্ডুকে। তিনি বলেছিলেন, “হে রাজন, আপনি যেমন আমাকে পরম সুখের মূহুর্তে অন্যায়ভাবে বধ করলেন, ঠিক তেমনভাবে আপনিও যখন নারীসঙ্গ করবেন, সেই মূহুর্তে আপনারও মৃত্যু হবে।”

কিন্দম মুনির দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে ভ্রাতা ধৃতরাষ্ট্রকে রাজা নিযুক্ত করে রাজ্যপাট ত্যাগ করেন মহারাজ পাণ্ডু। তিনি তাঁর দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রীকে নিয়ে শতশৃঙ্গ পর্বতে এসে তপস্বী জীবন যাপন করা শুরু করলেন। এবং সেখানেই দেবতাদের প্রসাদে জন্ম হয়েছিল পঞ্চপাণ্ডবের।

আরও পড়ুনঃ  কুম্ভমেলার ইতিহাস ও অজানা তথ্য

শতশৃঙ্গ পর্বতে তিনি ত্রিকালজ্ঞ ঋষিদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন দীর্ঘকাল। এবং সেই মহাজ্ঞানী ঋষিদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে কঠোর থেকে কঠোর তপস্যা, যোগসাধন এবং ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন তিনি। এর ফলে তিনি একসময় অলৌকিক জ্ঞান ও ত্রিকালদর্শিতার অধিকারী হন।

কিন্তু বিধি বাম। কোন এক বসন্তে ২য় স্ত্রী মাদ্রীর রূপে মোহিত ও কামার্ত হন পাণ্ডু। এবং এরপর যখন তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে লিপ্ত হতে গেলেন ঠিক তখনই মৃত্যুমুখে পতিত হন তিনি। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে পাণ্ডু অনুধাবন করলেন, তাঁর দীর্ঘকালের অর্জিত প্রজ্ঞা তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই বিলীন হয়ে যাবে। তাই তিনি তাঁর পুত্রদেরকে ডেকে আদেশ দিলেন, তিনি মারা যাওয়ার পরে পাণ্ডবগণ যেন তাঁর শরীরের মাংস তথা মস্তিষ্ক ভক্ষণ করেন। এতে মহারাজ পাণ্ডুর অর্জিত ত্রিকালদর্শিতা তাঁর পুত্রদের মধ্যে প্রবাহিত হবে।

কিন্তু মহারাজ পাণ্ডু মৃত্যুবরণ করলে জ্যেষ্ঠ চার পুত্র তথা যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন ও নকুল পিতার মাংস ভক্ষণ করতে দ্বিধা করলেন। তাঁরা লোকলজ্জা এবং ধর্মীয় সংস্কারের কারণে পিতার এই আদেশ পালন করতে ব্যার্থ হলেন। তবে সহদেব ছিলে দৃঢ়চিত্ত। তিনি তাঁর পিতার মস্তিস্কের একটি ছোট্ট অংশ তুলে নিয়ে সেটিকে তিনটি গ্রাসে ভক্ষণ করেন।

সহদেব যখন প্রথম গ্রাস মুখে দেন তখন তাঁর মনে অতীতের সমস্ত জ্ঞান ভেসে ওঠে। জগতের সৃষ্টির আদি থেকে যা যা ঘটেছে, সবকিছু সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত হন। দ্বিতীয় গ্রাস খাওয়ার সাথে সাথে তিনি বর্তমান জগতের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি ক্ষণে কী ঘটছে তা দেখতে পান। এবং তৃতীয় গ্রাস খাওয়ার পর তিনি ভবিষ্যতের স্পষ্ট রূপ নিজের চোখের সামনে দেখতে পান। তিনি জানতে পারেন সামনে কি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে চলেছে সমস্ত আর্যাবর্তে। আর এভাবেই সহদেব হয়ে উঠলেন ত্রিকালজ্ঞ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবকিছু জানার পরেও কেন তিনি তা তাঁর ভ্রাতাদের কাছে প্রকাশ করেননি? তিনি যদি সবকিছু আগে থেকেই ভ্রাতাদেরকে বলে দিয়ে সতর্ক করতেন তাহলে মহাভারতে এত করুণ ঘটনাগুলো ঘটার সুযোগই পেত না।

আরও পড়ুনঃ  পঞ্চতত্ত্ব কারা? শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ,অদ্বৈতাচার্য, গদাধর,ও শ্রীবাসের আসল পরিচয় || Pancha Tattva

আর এখানেই চলে আসে মহাভারতের আরও এক ত্রিকালজ্ঞের প্রসঙ্গ। আজ্ঞে হ্যাঁ, তিনি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জানতেন সহদেব তাঁর পিতার আশির্বাদে ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত। কিন্তু সহদেব যদি আগে থেকেই তাঁর ভ্রাতদেরকে ভবিষ্যৎ বলে দেন তাহলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার ধারণের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চেয়েছিলেন নতুন সৃজনের জন্য সম্পূর্ণ বিনাশের প্রয়োজন। এবং এই কারনেই মহাভারতের কুশীলবদেরকে ধীরে ধীরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এবং এর মধ্যে যদি সহদেব সকলকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞাত করান তাহলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেই উদ্দেশ্য সফল হবে না।

তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহদেবকে এক কঠিন শর্ত দিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি সহদেব ভবিষ্যতের কোন কথা প্রকাশ করেন, তাহলে সাথে সাথেই তাঁর মস্তক দ্বিখণ্ডিত হবে।

আর এই শর্তের কারণেই সহদেব কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত, আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু এবং ধ্বংসের কথা জেনেও আজীবন নীরব ছিলেন। তিনি জানতেন কর্ণ তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, তিনি জানতেন শকুনি কীভাবে পাশা খেলায় কারচুপি করবেন। কিন্তু ধর্মের গ্লানি দূর করতে এবং ভগবানের ইচ্ছা পূরণ করতে তিনি সেই পরম সত্য নিজের মনের গহীনে চেপে রেখেছিলেন। তাঁর এই নীরবতা ছিল এক চরম ত্যাগ। আর এভাবেই ত্রিকালজ্ঞ হয়েও সারাজীবন জ্ঞানের ভার বহন করে চলতে হয়েছিল সহদেবকে।

তবে আরও একটি লোকথায় জানা যায়, পাণ্ডু যখন তাঁর পুত্রদেরকে তাঁর মস্তিস্ক ভক্ষণের আদেশ দেন, তখন তিনি তাঁদেরকে ভবিতব্যকে প্রকাশ না করার আদেশ প্রদান করেন।

সহদেবের এই কাহিনী থেকে আমাদের অনুধাবন করা উচিত যে, জ্ঞান লাভ করা যতটা কঠিন, সেই জ্ঞানের ভার বহন করা তার চেয়েও কঠিন। সহদেব জানতেন ভবিষ্যৎ কী, কিন্তু তিনি পরিস্থিতির কাছে নত স্বীকার না করে বা আবেগের বশবর্তী না হয়ে ধৈর্যের সাথে নিজের কর্তব্য পালন করে গেছেন। ঠিক সেভাবে জীবন আমাদেরকে অনেক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, কিন্তু সময় ও সুযোগ বুঝে সেই সত্যকে ব্যবহার করাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। সহদেব ছিলেন মহাভারতের সেই নীরব সাক্ষী, যার ত্যাগের কথা ইতিহাসে খুব কমই বলা হয়, কিন্তু তাঁর এই অবদানের কারনে আজও আলাদাভাবে স্মরণ করা হয় সহদেবকে।

আরও পড়ুনঃ  মহাভারতের শহরগুলো / স্থানসমূহ এখন কোথায়? Present Locations of Cities Mentioned in Mahabharat.

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ সহদেবের এই কাহিনীটি ব্যাসদেবের মূল সংস্কৃত মহাভারতে পাওয়া যায় না। তবে দক্ষিণ ভারতীয় তেলেগু লোক-মহাভারত, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার যক্ষগানম, কন্নড় ও তামিল ভাষার পম্পা ভারতের লোক সংস্করণ এবং মধ্যযুগীয় কিছু তান্ত্রিক উপাখ্যানের পাণ্ডুলিপিতে এই কাহিনীটির বিবরণ পাওয়া যায়।

 

Leave a Comment