ঋষি দুর্বাসার অভিশাপের কবল থেকে রেহাই পাননি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, দেবী লক্ষ্মীর অবতার রুক্মিণী, দেবী সরস্বতী, দেবী গঙ্গা, এবং তার নিজের স্ত্রী কন্দলী দেবীও। ভগবান শিবের ক্রোধাগ্নি থেকে জন্ম নেওয়া এই শিবাংশের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতেন দেবতা, দানব, মানব, গন্ধর্ব থেকে শুরু করে স্বর্গের অপ্সরাগণও। আসুন জেনে নেওয়া যাক এই অতি ক্রোধসম্পন্ন ঋষির প্রদত্ত্ব ৭টি মারাত্মক অভিশাপ ও তার ফলাফলের কাহিনী।
১. দেবরাজ ইন্দ্রকে অভিশাপ
একদা দুর্বাসা মুনির সাথে সাক্ষাৎ ঘটে ঐরাবতের ওপর আসীন উজ্জ্বল এবং প্রভাময় দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে। দেবরাজ ইন্দ্রকে দেখে ঋষি দুর্বাসা একটি প্রসাদী পুষ্পমাল্য দেবরাজ ইন্দ্রকে উপহার দেন। কিন্তু মদমত্ত ইন্দ্রদেব দুর্বাসার দেওয়া পুষ্পমাল্যের গুরুত্ত্ব অনুধাবন করতে না পেরে তা তার বাহন ঐরাবত হস্তীর মাথায় স্থাপন করেন। ঐরাবত সেই মালাটিকে শুড় দিয়ে মাথা থেকে নামিয়ে সেটিকে ছিন্ন ভিন্ন করে তারপর পদলে পিষ্ট করে দেয়।
এ দৃশ্য দেখে অগ্নিগর্ভের স্ফুলিঙ্গের মত ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন দুর্বাসা। তিনি দেবরাজ ইন্দ্র ও স্বর্গরাজ্যকে শ্রীহীন হওয়ার অভিশাপ দেন। ঋষির এই অভিশাপের প্রভাবে কিছুদিনের মধ্যেই ত্রিপুরাসুরের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন দেবতাগন এবং স্বর্গরাজ্য থেকে বিতাড়িত হন। এরপর ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশে সমুদ্র মন্থন করে অমৃত উত্তোলন করে পান করেন দেবতাগন। এবং তারপর আবারও অসুরদের সাথে যুদ্ধ করে হারানো স্বর্গরাজ্য পুনরুদ্ধার করেন তারা।
২. শকুন্তলাকে অভিশাপ
মহাভারতের আদিপর্ব ও কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম থেকে শকুন্তলার এই কাহিনীটি জানা যায়। দেবরাজ ইন্দ্রের প্ররোচনায় মহর্ষি বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করেছিলেন মেনকা নামক এক অপরূপা স্বর্গীয় অপ্সরা। এরপর এদের প্রণয়ের ফল হিসেবে জন্ম হয়েছিল এক ফুটফুটে কন্যা শিশুর। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ঋষি বিশ্বামিত্র ও অপ্সরা মেনকা দুজনেই এই নবজাতিকাকে পরিত্যাগ করেন। একদিন কণ্ব ঋষি তার তপোবনের পার্শ্ববর্তী নদীর তীর থেকে সেই ফুটফুটে কন্যাশিশুকে উদ্ধার করেন। কণ্ব মুনি শিশুটিকে নিজের কন্যা হিসেবে লালন পালন করলেন এবং যেহেতু শকুন পক্ষীরা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল তাই তার নামকরণ করেছিলেন শকুন্তলা।
একদা সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা শকুন্তলার সাথে সাক্ষাৎ ঘটে দুষ্মন্ত নামের পরম সুদর্শন ও পরাক্রমশালী এক রাজার। রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা প্রথম দর্শনেই একে অপরের প্রতি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়লেন। এরপর দুজনের মধ্যে প্রথমে প্রণয় ও পরে গান্ধর্বমতে পরিনয় সম্পন্ন হল। রাজা দুষ্মন্ত নিজের রাজ্যে ফিরে যাওয়ার সময় কণ্ব মুনি আশ্রমে ছিলেন না। ফলে পালক পিতার জন্য আশ্রমে অপেক্ষা করতে লাগলেন শকুন্তলা। অন্যদিকে রাজ্যপাট সামলানোর জন্য নিজ রাজ্যে ফিরে গেলেন রাজা দুষ্মন্ত। যাওয়ার সময় রাজা দুষ্মন্ত বলে গেলেন তিনি শীঘ্রই ফিরে এসে শকুন্তলাকে নিয়ে যাবেন।
রাজা দুষ্মন্তের প্রস্থানের পর থেকে সর্বদাই তার চিন্তায় লীন হয়ে থাকতেন শকুন্তলা। এভাবে কিছুকাল যাওয়ার পর একদিন ঋষি দুর্বাসা এলেন কণ্ব মুনির আশ্রমে। কিন্তু সেসময় শকুন্তলা তার মনোজগতে এমন গভীরভাবে মগ্ন ছিলেন যে, তিনি ঋষি দুর্বাসার উপস্থিতি অনুভব করতেই পারেন নি। ফলে ঋষি দুর্বাসা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে শকুন্তলাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, “যার চিন্তায় তুমি আমাকে অবহেলা করেছ, সেই তোমাকে বিস্মৃত হবে।” অর্থাৎ দুর্বাসার অভিশাপে রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে ভুলে যাবেন। ঋষি দুর্বাসার এই অভিশাপে সম্বিৎ ফিরে পেলেন শকুন্তলা। তিনি তৎক্ষণাৎ দুর্বাসার চরণতলে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। শকুন্তলার দুই সখী প্রিয়ংবদা ও অনুসূয়াও দুর্বাসার কাছে এই অভিশাপ প্রশমিত করার অনুনয় করলেন। এর ফলে দুর্বাসার ক্রোধ কিছুটা শান্ত হল। তিনি বললেন, “রাজা দুষ্মন্ত তোমাকে বিস্মৃত হবেন সত্য, তবে তুমি যদি তাকে কোন অভিজ্ঞান প্রদর্শন করতে পারো তবে তোমার সকল স্মৃতি আবার তার মনে পড়বে।”
অভিজ্ঞান হচ্ছে কোন সাংকেতিক চিহ্ন বা বস্তু। শকুন্তলার মনে পড়ল গান্ধর্ব বিবাহের সময় রাজা দুষ্মন্ত তাকে একটি অঙ্গুরীয় বা আংটি উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু হায় কিছুদিন আগে স্নানের সময় তা নদীর জলে হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। অগত্যা শকুন্তলা রাজা দুষ্মন্তের রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। তা সত্ত্বেও রাজা দুষ্মন্ত তাকে কোনভাবেই চিনতে পারলেন না। কিছুকাল পরে রাজ্যের এক ধীবর মাছের পেট থেকে আবিষ্কার করলেন এক অতি মূল্যবান এক অঙ্গুরীয়। এরপর সেই ধীবরের মাধ্যমে অঙ্গুরীয়টি রাজার নিকটে পৌছালে, শকুন্তলার স্মৃতি আবারও মনে পড়ে রাজা দুষ্মন্তের। তিনি শকুন্তলা ও তার পুত্রকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে স্ত্রী ও পুত্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন।
৩. দেবী গঙ্গাকে অভিশাপ
একদা স্বর্গে স্নান করার সময় ঋষি দুর্বাসার অঙ্গবস্ত্র জলে ভেসে যায়। দূর থেকে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন শিশু গঙ্গা। দুর্বাসার এ অবস্থা দেখে কি করা উচিত বা অনুচিত এরকম কোন জ্ঞান তখনো গঙ্গার হয়নি। তাই এরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে বালিকাসুলভ খিল খিল করে হেসে উঠেছিলেন তিনি। শিশু হওয়ার সত্ত্বেও দেবী গঙ্গার এরকম আচরণে বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হন দুর্বাসা। তিনি দেবী গঙ্গাকে অভিশাপ দিয়ে বসেন, আমার প্রতি অসম্মান ও অবহেলা প্রদর্শন করার জন্য তোমাকে নদীরূপে মর্ত্ত্যে জন্ম নিয়ে হবে। এবং তোমার জলে স্নান করেই মানুষ তার পাপ ধৌত করবে।
৪. দেবী সররস্বতীকে অভিশাপ
কামধেনু তন্ত্র মতে, একদা ঋষি দুর্বাসা কিছু প্রশ্নের সঠিক সমাধান পাওয়ার জন্য ব্রহ্মলোক গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময় ভগবান ব্রহ্মা মাতা মহামায়ার মায়াবীজ জপ করছিলেন, এবং মাতা সরস্বতী বাগবীজের জপ করে অতি আনন্দে বীণা বাদন করছিলেন। কিন্তু মায়াবীজের আনন্দে মত্ত হয়ে দেবী সরস্বতী ঋষি দূর্বাসাকে দেখেও উপেক্ষা করে বসলেন। ফলে অতি ক্রুদ্ধ দুর্বাসা দেবী সরস্বতী কে মুর্খ হয়ে মর্ত্যলোকে জন্ম নেওয়ার অভিশাপ দিলেন।
এতে মাতা সরস্বতী অনুতাপ করে মহর্ষি দূর্বাসার কাছে ক্ষমা চাইলেন। এবং বেদপতি ভগবান ব্রহ্মদেবও দুর্বাসাকে অভিশাপ প্রশমিত করার অনুরোধ করলেন।
মহর্ষি দূর্বাসা এবার শান্ত হয়ে বললেন, “হে ত্রিভুবনেশ্বরী জগৎমাতা মা সরস্বতী, আপনি অবশ্যই মুর্খা হয়ে মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ করবেন, কিন্তু আপনি পরম বিজ্ঞ ব্রহ্মর্ষি ভৃগু মুনির গৃহে জন্মগ্রহণ করে তার কাছ থেকে শিক্ষালাভ করে পুণর্বার নিজের জ্ঞানশক্তিকে ফিরে পাবেন।”
কিছুকাল পরে মহর্ষি ভৃগুর কন্যা হিসেবে মর্ত্ত্যে আবির্ভূতা হলেন দেবী সরস্বতী। মহর্ষি ভৃগু প্রবল তেজদীপ্ত এই কন্যার নামকরণ করলেন সাবিত্রী নামে। ছোট্টবেলা থেকেই সাবিত্রী বেদপতি ব্রহ্মার আরাধনা করতেন, এবং মহাজ্ঞানী মহর্ষি ভৃগুর কাছ থেকে শিক্ষালাভ করে পরম জ্ঞানী হয়ে উঠলেন তিনি।
সাবিত্রী বিবাহযোগ্যা হলে নিজের এই মহাজ্ঞানী কন্যার জন্য এক স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলেন মহর্ষি ভৃগু। তিনি সমস্ত দেবতাদেরকে সেই সভায় আমন্ত্রিত করলেন এবং ঘোষনা করলেন, যিনি জ্ঞান ও তর্কে আমার পুত্রীকে পরাজিত করতে পারবেন তিনিই একমাত্র তার স্বামী হওয়ার যোগ্য হবেন।
সয়ংবর সভায় যথারীতি ব্রহ্মদেব ব্যাতীত আর কেউই জ্ঞান ও তর্কে সাবিত্রীকে পরাজিত করতে পারলেন না। ফলে বৈশাখ শুক্ল দশমীতে আবারও ভগবান ব্রহ্মার সাথে স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করলেন সাবিত্রীরূপিণী মাতা সরস্বতী।
৫. নিজ স্ত্রী কন্দলীকে অভিশাপ
ঋষি দুর্বাসা বিবাহ করেছিলেন ঔর্ব মুনির কন্যা কন্দলী দেবীকে। এই কন্দলী দেবী ছিলেন অতিশয় কলহপ্রিয় ও মুখরা একজন রমনী। তাই বিবাহ কালে ঔর্ব ঋষি তার কন্যার শত দোষ ক্ষমা করতে অনুরোধ করেছিলেন জামাতা দুর্বাসাকে। দুর্বাসাও তার শ্বশুর ঔর্ব ঋষিকে কথা দিয়েছিলেন তিনি তার স্ত্রীর শত অপরাধের ক্ষমা করবেন। কিন্তু অতি কলহপ্রিয় এই কন্যা অল্পদিনের মধ্যেই একশত দোষ পূর্ণ করে ফেলেন। এবং ঋষি দুর্বাসাও একে একে এই একশত অপরাধ ক্ষমা করে দেন। এরপর একশো এক তম অপরাধটি করা মাত্রই ঋষি দুর্বাসা অভিশাপ দিয়ে তাকে ভষ্ম করে দেন। পরবর্তীতে সেই ভষ্ম থেকেই তিনি একটি গাছ সৃষ্টি করেন এবং তার নাম দেন কন্দলী বৃক্ষ। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই কন্দলী বৃক্ষকে আজ আমরা কলা গাছ নামেই চিনি। এবং সকল প্রকার পুজো পার্বনে কলা গাছের ফল ও পাতা আমরা ব্যবহার করে থাকি।
৬. মাতা রুক্মিণীকে অভিশাপ
একদা দ্বারকা নগরীতে অতিথি হিসেবে আগমন করেছিলেন ঋষি দুর্বাসা। তার আগমনের সংবাদ পেয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও মাতা রুক্মিণী স্বয়ং রথ টেনে মুনিকে নগরের প্রবেশস্থল থেকে প্রাসাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মূলত দুর্বাসার প্রতি সম্মান প্রদর্শন হেতু স্বয়ং জগতের প্রতিপালক ও মাতা লক্ষ্মী নিজেদেরকে রথ টানায় নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু রথ টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে মাতা রুক্মিণী দুর্বাসার অনুমতি ছাড়াই সামান্য জল পান করেছিলেন। এতেই প্রচণ্ড অসম্মানিত বোধ করেন ঋষি দুর্বাসা। আর এই অপরাধে তিনি মাতা রুক্মিণীকে অভিশাপ দিলেন, রুক্মিণী তার স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। বলা হয়, দুর্বাসার এই অভিশাপের কারনে দ্বারকায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকাধীশ মন্দির ও মাতা রুক্মিণীর মন্দির একে অপরের থেকে প্রায় দু কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
৭. ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অভিশাপ
মজার ব্যাপার হল, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণও দুর্বাসার অভিশাপের প্রকোপ থেকে রেহাই পাননি। দুর্বাসাকে দ্বারকার রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে সুমিষ্ট পায়েস অর্পণ করেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। দুর্বাসা সেখান থেকে কিছুটা পায়েস গ্রহণ করে বাকিটুকু ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রসাদ হিসেবে দান করেছিলেন। তিনি এই প্রসাদী পায়েসটুকু ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিজের সারা শরীরে লেপন করার আদেশ দেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দুর্বাসার এই আদেশ মেনে নিয়ে নিজের সারা শরীরে পায়েস লেপন করেন। কিন্তু যেহেতু এটি প্রসাদী পায়েস তাই দুর্বাসার সম্মানার্থে তিনি তার চরণযুগলে এই পায়েসের প্রলেপ দেন নি। এ ঘটনায় দুর্বাসা শ্রীকৃষ্ণকে একই সাথে একটি আশির্বাদ ও অভিশাপ দেন। তিনি বলেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি তোমার শরীরের যে যে স্থানে এই পায়েস লেপন করেছ তা অভেদ্য হবে। এবং যে স্থানে পায়েস লেপন করো নি তা তোমার দূর্বল অঙ্গ হবে।” বলা হয় দুর্বাসার এই অভিশাপের কারনে জরা ব্যাধের ছোঁড়া তীর যখন শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণে বিদ্ধ হয় তখন তিনি মর্ত্যধাম ত্যাগ করেন।
প্রিয় দর্শক, সাধারন দৃষ্টিতে ঋষি দুর্বাসাকে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ, ভয়ানক বা প্রচণ্ড অভিশম্পাতকারী বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে তার প্রত্যেকটি অভিশাপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সৃষ্টির বৃহত্তর কল্যান এবং ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রয়াস মাত্র।