একদা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার সিংহাসনে একাকী বসে ছিলেন। এমন তাঁর বাহন সময় গরুড় দেব এসে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করলেন, “হে প্রভু, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এই সমস্ত বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে আমার চেয়ে দ্রুতগতিতে উড়তে পারা কোন প্রাণি আছে কি? কারন আমার থেকে দ্রুতগতিসম্পন্ন কোন প্রাণি থাকলে আপনি নিশ্চই আমাকে আপনার বাহন হিসেবে গ্রহণ করতেন না।” শ্রীকৃষ্ণ গরুড়ের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন মাত্র। প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে গরুড়দেব প্রস্থান করলেন।
কিছুক্ষণ পরে সুদর্শন চক্র এলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করলেন, “হে প্রভু, আমার পরম সৌভাগ্য আমি আপনার অস্ত্র হিসেবে স্থান পেয়েছি। আমার প্রশ্ন, এই সমস্ত সৃষ্টিতে আমার চেয়ে শক্তিশালী কোন অস্ত্র আর আছে কি? কারন আমার থেকে শক্তিশালী কোন অস্ত্র থাকলে আপনি নিশ্চই আমাকে অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করতেন না।” শ্রীকৃষ্ণ এবারও সুদর্শন চক্রের প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। বরং মৃদু হেসে ইঙ্গিতের মাধ্যমে তাকে চলে যেতে বললেন। সুদর্শন চক্র কিইছুটা হতাশ হয়ে সেই স্থান ত্যাগ করলেন।
এরপর মাতা সত্যভামা এলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দরবারে। তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে নাথ, সবাই আমার সৌন্দর্যের প্রসংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু আমি আপনার শ্রীমুখ থেকে শুনতে চাই, ত্রেতা যুগে আপনার প্রিয় পত্নী সীতাদেবীর চেয়ে আমি কি অধিক সুন্দর নই? এই যুগেও আমার চেয়ে বেশী সৌন্দর্যের অধিকারিণী এমন কেউ আছে কি?”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারলেন, এরা সবাই অহংকারে অন্ধ হয়ে গিয়েছেন। এবং এদের অহংকার এখনই চূর্ণ না করলে তা আরও ভয়ানক আকার ধারণ করবে। তাই তিনি তাঁদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এবং তাঁদের অহংকার নাশ করার জন্য গরুড়কে ডেকে পাঠালেন। তিনি গরুড়কে বললেন, “ হে গরুড়, তুমি এখনই হিমালয়ে যাও। সেখানে গিয়ে দেখবে এক প্রাচীন গুহায় বসে এক বানর তপস্বী তপস্যা করছেন, তাকে গিয়ে বলো, দ্বারকায় তার জন্য সীতা এবং রাম প্রতীক্ষা করছেন। গরুড় বললেন, যথা আজ্ঞা প্রভু। এই বলে গরুড় তৎক্ষণাৎ উড্ডয়ন শুরু করলেন। এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্রকে ডেকে বললেন, “ আগামী বেশ কিছুটা সময় আমি জরুরী কাজে ব্যাস্ত থাকবো। আমি চাই এই সময়টাতে কেউ আমাকে বিরক্ত না করুক। তাই তুমি সিংহদ্বার পাহারা দাও। আমি না বলা পর্যন্ত যত মহান ব্যক্তিই আসুক, তুমি কাউকে অন্দরে প্রবেশ করতে দেবে না। এটা আমার আদেশ” সুদর্শন চক্র বললেন, যথা আজ্ঞা প্রভু। এই বলে সুদর্শন চক্র চলে গেলেন দ্বার প্রহরার কাজে। এবার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবার মাতা সত্যভামাকে ডেকে বললেন, “হে প্রিয়তমা, তুমি সমস্ত প্রকার শৃঙ্গার সামগ্রী দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করে আমার কাছে এসো। তোমার সৌন্দর্য এমনিতেই সর্বজনবিদিত। তবুও তুমি এমনভাবে শৃঙ্গার করো যেন, যে কোন অপ্সরা, দেবী কিংবা মানবী থেকেও তোমাকে অধিক সুন্দরী মনে হয়।” ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা শুনে সলজ্জ হাসি হেসে মাতা সত্যভামা চলে গেলেন শৃঙ্গার কক্ষে।
গরুড় হিমালয়ে পৌছে দেখতে পেলেন, এক বানর তপস্বী সেখানে তপস্যায় রত। তবে এই বানর তপস্বীই যে স্বয়ং হনুমান তা বুঝতে পারেন নি গরুড় দেব। তিনি গর্বের সাথে সেই বানর তপস্বীকে বললেন, “হে বানর, আমি স্বয়ং শ্রীহরির বাহন গরুড়। আমি তোমার জন্য একটি সংবাদ এনেছি। রঘুকুলপতি রাজা রাম ও তার পত্নী মাতা সীতা তোমার জন্য দ্বারকায় প্রতীক্ষা করছেন।” কিন্তু কি আশ্চর্য, এটুকু শোনামাত্রই হনুমান চোখের পলকে বায়ুবেগে প্রস্থান করলেন হনুমান। গরুড় দেব আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই বজ্রের গতিতে হনুমানের প্রস্থান দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন তিনি। গরুড় চেষ্টা করেছিলেন সেই বানর তপস্বীকে পিছু ধরার। কিন্তু অতি তীব্র গতিতে ধাবমান হনুমানের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারলেন না তিনি।
দ্বারকায় পৌছে হনুমান দেখতে পেলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রামরূপে সিংহাসনে বসে আছেন। শ্রীরাম হনুমানকে দেখে প্রাণ জুরানো হাসি দিয়ে তাকে স্বাগতম জানালেন। হনুমানও দীর্ঘদিন পরে নিজের পরম আরাধ্যের দর্শন পেয়ে ভক্তি ভরে প্রণাম করলেন এবং তার চরণতলে বসে পড়লেন। শ্রীরামচন্দ্র এবার কোমল স্বরে হনুমানকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মিত্র, আমার প্রাসাদে প্রবেশ করার আগে সিংহদ্বারে কেউ কি তোমাকে বাঁধা প্রদান করে নি? আমি তো আদেশ দিয়েছিলাম যে, কেউ যেন আমার কক্ষে প্রবেশ করতে না পারে।” হনুমান মৃদু হেসে বললেন, “প্রভু, একটি চক্র আমাকে বাঁধা প্রদান করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তার সাথে যুদ্ধ করতে হলে আপনার দর্শনে বিলম্ব হত। আমার কাছে আপনার দর্শনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। তাই আমি ওটাকে গিলে ফেলেছি।”
এরপর শ্রীহনুমান হা করে নিজের মুখের ভেতর থেকে সুদর্শন চক্রকে বের করে দিলেন। হনুমানের এই কাণ্ড দেখে হেসে ফেললেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্ররূপী ভগবান শ্রীকৃষ্ণও। কিছুক্ষণ পরে শ্রীহনুমানের নজর পড়ল মাতা সত্যভামার দিকে। মাতা সত্যভামা বহুমূল্য ও দুষ্প্রাপ্য সব শৃঙ্গার সামগ্রী ও প্রসাধন দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করে বসে ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাশে। হনুমান শ্রীরামচন্দ্রকে বললেন, “প্রভু আমার মাতা সীতা কোথায়? আপনারে পাশে যিনি বসে আছেন তিনি কি মাতা সীতার দাসী? এই সুন্দরী দাসীটিও আমার মাতা সীতার পাশে বড্ড বেমানান”। হনুমানের মুখে এই কথা শুনে লজ্জা এবং অপমানে লাল হয়ে গেলেন মাতা সত্যভামা। তিনি আর দ্বিতীয় কোন বাক্য উচ্চারণ না করে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। আর এসব কথোপকথনের মাঝখানে সেখানে এসে হাজির হলেন গরুড় দেব। তাঁদের সবার দিকে তাকিয়ে এবার মৃদু হাসলেন ভগবান রামরূপী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তারা সকলেই অনুধাবন করলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এক হনুমানকে দিয়েই তাঁদের সকল দম্ভ ও সামর্থ্যকে চূর্ণ করে দিয়েছেন। এই কাহিনীর প্রকৃত শিক্ষা এই যে, অহংকারীরা যতই সামর্থ্যবান বা যতবড় ভক্তি হন না কেন, ঈশ্বর কখনোই তাদেরকে পছন্দ করেন না। প্রকৃত নিষ্ঠা ও সমর্পণই তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশী প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ।