অর্জুন তার সখা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বললেন, “হে দেব! অগ্রহায়নের পুণ্যকারী কৃষ্ণপক্ষের একাদশীকে কেন ‘উৎপন্না একাদশী’ বলা হয় এবং কি জন্যই বা এই উৎপন্না একাদশী পরম পবিত্র ও দেবতাদেরও প্রিয়, তার মাহাত্ম্য জানতে ইচ্ছা করি। অনুগ্রহ করে আপনি আমাকে এই একাদশীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে আমার জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণ করুন।”
শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক অর্জুনকে উৎপন্না একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা
শ্রী ভগবান বললেন, “হে পৃথাপুত্র! পূর্বে সত্য যুগে ‘মুর’ নামে এক দানব ছিল। অদ্ভূত আকৃতি বিশিষ্ট সেই দানবের স্বভাব ছিল অত্যন্ত কোপন। সে দেবতাদেরও ভীতিপ্রদ ছিল। যুদ্ধে দেবতাদের এমনকি স্বর্গরাজ ইন্দ্রকে পর্যন্ত পরাজিত করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেছিল এই অসুর। তার কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দেবতারা স্বর্গরাজ্য থেকে পলয়ান করে মর্ত্ত্যধামে আত্মগোপন করেছিলেন। এক পর্যায়ে দেবতাগণ দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে গিয়ে নিজেদের সমস্ত দুঃখ সবিস্তারে বর্ণনা করলেন এবং এই দুর্গতি থেকে পরিত্রাণের উপায় প্রার্থনা করলেন। দেবতাদের দুঃখগাঁথা শুনে ভগবান শিব অত্যন্ত ব্যাথিত হলেন। তিনি বললেন, “হে দেবরাজ! যেখানে শরণাগতবৎসল জগন্নাথ, গরুধ্বজ বিরাজ করছেন, তোমরা সেখানে যাও। তিনি আশ্রিতদের পরিত্রাণকারী। তিনি নিশ্চয়ই তোমাদের মঙ্গল বিধান করবেন। দেবাদিদেবের কথা মতো দেবরাজ ইন্দ্র দেবতাদের নিয়ে ক্ষীর সাগরের তীরে গমন করলেন। জলে শায়িত শ্রী বিষ্ণুকে দর্শন করে দেবতারা হাত জোড় করে তাঁর স্তব করতে লাগলেন। স্তুতির মাধ্যমে নিজ নিজ দৈন ও দুঃখের কথা তারা ভগবানকে জানালেন।”
স্বর্গহারা দেবতাগণ কর্তৃক শ্রীনারায়ণের আশ্রয় প্রার্থনা
ভগবান নারায়ণ বললেন, “হে ইন্দ্র! তোমাদের স্তুতি শুনে আমি বুঝতে পেরেছি তোমাদের অতিশয় বিপদগ্রস্থ। তবে তোমাদেরকে উপায় প্রদর্শন করার আগে সেই মুর দানব কিরকম, সে কেমন শক্তিশালী, তা আমাকে বলো। ইন্দ্র বললেন, “হে জগদ্বীশ্বর! প্রাচীনকালে ব্রহ্ম বংশে তালজঙঘা নামে এক অতি পরাক্রমী অসুর ছিলেন। তারই পুত্র সেই মুর অত্যন্ত বলশালী, ভীষন উৎকট ও দেবতাদেরও ভয় উৎপাদনকারী। সে চন্দ্রাবতী নামে এক পুরীতে বাস করে। সে স্বর্গ থেকে আমাদের বিতাড়িত করে তার স্বজাতি কাউকে রাজা, কাউকে অন্যান্য দিকপালরূপে প্রতিষ্ঠিত করে এখন সে দেবলোক সম্পূর্ণ অধিকার করেছে। তার প্রবল প্রতাপে আজ আমরা পৃথিবীতে আত্মগোপন করে আছি।” ইন্দ্রের কথা শুনে ভগবান শ্রীবিষ্ণু দেবদ্রোহী মুর ও তার অসুর বাহিনীর প্রতি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি দেবতাদের সঙ্গে চন্দ্রাবতী পুরীতে গেলেন। সেখানে শ্রীনারায়ণকে দর্শন করে দৈত্যরাজ মুর পুনঃ পুনঃ গর্জন করতে লাগল।
দেবাসুরের যুদ্ধ
কিছুক্ষণের মধ্যেই আবারও শুরু হল দেবাসুরের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্য। অসুররাজ মুর ও তার বিশাল অসুর বাহিনীর প্রণ্ড তাণ্ডবে ত্রাহি ত্রাহি রবে পলায়ন করলেন দেবতাগণ। যুদ্ধভূমিতে একাই দাঁড়িয়ে রইলেন শ্রীনারায়ণ। তখন যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রী নারায়ণকে একা দেখে সেই দানব তাঁকে ‘দাঁড়াও দাঁড়াও’ বলতে বলতে তাঁর দিকে ধাবিত হল। শ্রী ভগবানও ক্রোধে গর্জন করতে করতে বললেন, “রে দুরাচার দানব! আমার বাহুবল দেখ।” এই বলে অসুরপক্ষীয় সমস্ত যোদ্ধাদের দিব্য বাণের আঘাতে নিহত করতে লাগলেন। ফলশ্রুতিতে, অসুর সেনারা প্রাণভয়ে নানা দিকে পালাতে লাগল। এসময় শ্রীনারায়ণ দৈত্য সেনাদের বিরুদ্ধে সুদর্শন চক্র নিক্ষেপ করলেন। ফলে সমস্ত সেনা ধ্বংসপ্রাপ্ত হল।
কিন্তু শ্রীনারায়ণের তীব্র প্রহারকে মোকাবেলা করে মুর দানব জীবিতই থেকে গেল। উল্টো, তাঁর বিপুল পরাক্রম দ্বারা শ্রীবিষ্ণুকে আক্রমণ করে ত্রিভূবনের অধিপতিকেও নাস্তানাবুদ করে দিল সে। এক পর্যায়ে দৈত্যরাজ মুর অস্ত্র যুদ্ধে নারায়ণকেও পরাজিত করল। তারপর শুরু হল শ্রীভগবান ও মুরের মধ্যে বাহুযুদ্ধ। কিন্তু এভাবেও এক সহস্র দৈব বছর যুদ্ধ করেও ভগবান শ্রীবিষ্ণু অসুর মুরকে পরাজিত করতে পারলেন না। চিন্তিত হলেন শ্রীহরি, তিনি রণে ক্ষ্যান্ত দিয়ে বদরিকা আশ্রমে গমন করলেন সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার জন্য।
শ্রীবিষ্ণুর বিশ্রাম ও দিব্য কন্যার আবির্ভাব
বদরিকাশ্রমে সিংহাবতী নামে একটি অতি বিশাল গুহা অবস্থিত। এই গুহাটি এক-দ্বার বিশিষ্ট এবং বারো যোজন অর্থাৎ ছিয়াশি মাইল বিস্তৃত। অসুর মুরের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে ভগবান বিষ্ণু সেই গুহার মধ্যে শয়ন করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গভীর নিদ্রায় মগ্ন হলেন। কিন্তু ভগবান শ্রীবিষ্ণু বুঝতে পারেননি যে, অসুর মুর তাঁর পিছু করতে করতে বদরিকাশ্রমের সিংহাবতী গুহা পর্যন্ত চলে এসেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সেই মুরাসুরও তার পিছন পিছন ধাবিত হয়ে গুহার মধ্যে প্রবেশ করল। সে বুঝতে পারল তাঁর সাথে যুদ্ধে ক্লান্ত শ্রীবিষ্ণু গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত। মনে মনে প্রচণ্ড গর্ব ও আনন্দিত হল মুর। সে ভাবতে লাগল, “আমার সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিষ্ণু এখানে গোপনে শুয়ে আছে। আমি কতই না বড় পরাক্রমশালী বীর। এবার আমি তাকে বধ করে আমার বীরত্বের চূড়ান্ত রূপ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে প্রদর্শন করব। দানব এই রকম চিন্তা করতে করতে যখন নিদ্রারত শ্রীবিষ্ণুকে প্রহার করতে উদ্যত হল, ঠিক সেই সময় শ্রীবিষ্ণুর শ্রীঅঙ্গ থেকে এক দিব্য কন্যা উৎপন্ন হল। তিনি অতি রূপবতী, সৌভাগ্যশালিনী, দিব্য অস্ত্র-শস্ত্র ধারিনী, বিষ্ণু তেজসম্ভূতা এবং মহাপরাক্রমশালিনী ছিলেন।
দিব্যকন্যার সাথে মুরের যুদ্ধ
শ্রীবিষ্ণুর শরীর থেকে উদ্ভূতা সেই পরমা সুন্দরী নারীমূর্তিকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল মুর। অগত্যা শ্রীবিষ্ণুকে বধ করার পরিবর্তে সেই দিব্য নারীমূর্তির সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হল মুর। বহুকাল যাবত চলতে লাগল তাঁদের যুদ্ধে। অবশেষে সেই দেবীর দিব্য তেজে অসুর পরাস্ত হল। এরপর সেই দিব্যকন্যা দৈত্যরাজ মুরকে বধ করে তার অপশাসন থেকে মুক্ত করল ত্রিভূবনকে।
শ্রীবিষ্ণু কর্তৃক দিব্যকন্যাকে আশির্বাদ ও বরদান
এর কিছুকাল পরে মহানিদ্রা থেকে জেগে উঠলেন শ্রীবিষ্ণু। তিনি দেখতে পেলেন, এক পরমাসুন্দরী দিব্যকন্যা হাত জোড় করে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আর পাশেই পড়ে আছে অসুর মুরের ভস্মীভূত দেহাবশেষ। ভগবান বিষ্ণু তখন সেই দিব্যকন্যাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে পরাক্রান্ত উগ্র মূর্তি! কে তুমি আমার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছো? আর এই মুর দানবকে কে বধ করল়? যিনি একে বধ করেছেন তিনি নিশ্চয়ই প্রশংসনীয় কর্ম করেছেন।” সেই দিব্য কন্যা বললেন, “হে প্রভু! আমি আপনার শরীর থেকে উৎপন্ন হয়েছি। আপনি যখন ক্লান্তিনিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিলেন, তখন এই দানব আপনাকে বধ করতে উদ্যত হয়েছিল। তা দেখে আমি তাকে বধ করেছি।”
একথা শুনে শ্রীভগবান বললেন, “এই মহাবলশালী অসুরকে বধ করে তুমি শুধু আমাকেই নও, এই সমগ্র সৃষ্টিকে রক্ষা করেছ। দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ, মানব সকলেই তোমার এই বীরত্বের সুফল প্রাপ্ত হবে। আর আমার পরাশক্তি হিসেবে তুমি একাদশী তিথিতে উৎপন্ন হয়েছ, তাই তোমার নাম হবে ‘উৎপন্না একাদশী’। আমি এই ত্রিলোকে দেবতা ও ঋষিদের অনেক বর প্রদান করেছি। হে ভদ্রে! তুমিও তোমার মনমতো বর প্রার্থনা কর। আমি তোমাকে তা প্রদান করব।” উৎপন্না একাদশী বললেন-, “হে দেবেশ! ত্রিভুবনের সর্বত্র আপনার কৃপায় সর্ববিঘ্ননাশিনী ও সর্বদায়িনী রূপে যেন পরম পূজ্য হতে পারি, এ বিধান করুন। আপনার প্রতি ভক্তি বশতঃ যারা শ্রদ্ধা সহকারে আমার (উৎপন্না একাদশী) ব্রত উপবাস করবে, তাদের সর্ব সিদ্ধিলাভ হবে, এই বর আমাকে প্রদান করুন।”
শ্রীভগবান বললেন, “হে কল্যাণী! তাই হোক! ‘উৎপন্না’ নামে পরিচিত তোমার ব্রত পালনকারীর সমস্ত ইচ্ছা পূর্ণ হবে। তুমি তাদের সকল মনোবাসনা পূর্ণ করবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। আমি তোমাকে আমার শক্তি বলে মনে করি। তাই তোমার ব্রত পালনকারী সকলে আমারই পূজা করবে। এর ফলে তারা মুক্তি লাভ করবে। তুমি হরিপ্রিয়া নামে জগতে প্রসিদ্ধ হবে। তুমি ব্রত পালনকারীর শত্রু বিনাশ, পরমগতি দান এবং সর্বসিদ্ধি প্রদান করতে সমর্থ হবে।”
উৎপন্না একাদশী পালনের ফল
১. শত যজ্ঞ ও কোটি গোদানের পুণ্য লাভ
- অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল: শাস্ত্র বলে, এই দিন উপবাস করলে একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ এবং সহস্র বাজপেয় যজ্ঞ করার সমতুল্য পুণ্য অর্জিত হয়।
- মহাদান: সূর্যগ্রহণের সময় কুরুক্ষেত্রে গিয়ে স্বর্ণদান বা গঙ্গাসাগরে কোটি গাভী দান করলে যে ফল মেলে, উৎপন্না একাদশীর উপবাসে তার চেয়েও বেশি ফল পাওয়া যায়।
২. মহাপাপ ও ত্রিবিধ তাপ থেকে মুক্তি
- ব্রহ্মহত্যা ও গুরুপত্নী গমনের পাপ মোচন: শাস্ত্রে ব্রহ্মহত্যা বা গুরুর অবমাননাকে মহাপাপ বলা হয়েছে। পদ্ম পুরাণে উল্লেখ আছে, নিষ্ঠা ভরে উৎপন্না একাদশী পালন করলে এই জাতীয় ভয়ংকর জন্ম-জন্মান্তরের পাপও ভস্মীভূত হয়ে যায়।
- পিতৃকুলের উদ্ধার: এই ব্রতের পুণ্যফল কেবল ব্রতকারী নিজে পান না, বরং তাঁর পূর্বপুরুষ বা পিতৃপুরুষেরা যদি নরককষ্টে থাকেন, তবে তাঁরাও মুক্ত হয়ে স্বর্গলোক লাভ করেন।
৩. সমস্ত তীর্থভ্রমণের শ্রেষ্ঠ ফল
৪. মোক্ষ লাভ এবং বৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি
- যেহেতু এই তিথিতে স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর শরীর থেকে মহাশক্তি (একাদশী দেবী) উৎপন্ন হয়ে ‘মুর’ নামক অসুরকে (যা মূলত মানুষের ভেতরের অহংকার ও তামসিকতার প্রতীক) বধ করেছিলেন, তাই এই ব্রত পালন করলে মানুষের ভেতরের সব আসুরিক প্রবৃত্তি ধ্বংস হয়।
- ব্রতকারীকে মৃত্যুর পর যমলোকের শাস্তি ভোগ করতে হয় না, তিনি সরাসরি বিষ্ণুলোক বা বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্ত হন।
৫. ইহলৌকিক সুখ ও সমৃদ্ধি
- এই ব্রত পালনে মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায় এবং বুদ্ধির বিকাশ ঘটে।
- পারিবারিক জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি এবং ধন-ধান্যের অভাব দূর হয়। কারণ একাদশী ব্রতে স্বয়ং মা লক্ষ্মী ও নারায়ণ সন্তুষ্ট হন।
উৎপন্না একাদশী পালনের সঠিক নিয়ম
১. দশমী তিথির নিয়ম (পূর্ব প্রস্তুতি)
- একাহার: দশমীর দিন দুপুরে একবার মাত্র সাত্ত্বিক অন্ন আহার করতে হবে।
- বর্জনীয় খাদ্য: দশমীর রাতে কোনো প্রকার আহার করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। বিশেষ করে কাঁসার পাত্রে ভোজন, মাংস, মসুর ডাল, মধু, শাক এবং চালের তৈরি খাবার পরিহার করতে হবে।
- ব্রহ্মচর্য: দশমীর রাত থেকে সম্পূর্ণ ব্রহ্মচর্য পালন করতে হবে এবং মাটিতে বা কুশের শয্যায় ঘুমানোর বিধান।
২. একাদশী তিথির নিয়ম (মূল ব্রত দিবস)
ব্রাহ্ম মুহূর্ত ও স্নান: সূর্যোদয়ের অন্তত ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট আগে (ব্রাহ্ম মুহূর্তে) ঘুম থেকে উঠতে হবে। এরপর পবিত্র জলাশয় বা গঙ্গাজল মিশ্রিত জলে স্নান করতে হবে।
সংকল্প গ্রহণ: স্নান শেষে পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধান করে ভগবান বিষ্ণুর মূর্তির সামনে হাত জোড় করে ব্রতের সংকল্প করতে হবে: “হে পুণ্ডরীকাক্ষ! হে জনার্দন! আমি আজ উৎপন্না একাদশীর সম্পূর্ণ উপবাস ব্রত পালন করব, আপনি কৃপা করে আমার এই ব্রত গ্রহণ করুন।”
উপবাসের প্রকারভেদ: শাস্ত্রে তিন ধরনের উপবাসের কথা বলা হয়েছে:
- নির্জলা: কোনো প্রকার জল বা খাদ্য গ্রহণ না করে (সবচেয়ে উত্তম)।
- সজলা: কেবল জল পান করে।
- অনুকল্প বা ফলার: জল, দুধ, ফলমূল, বা আলুর মত সামান্য খাদ্য গ্রহণ করে।
বর্জনীয় উপাদান: একাদশীর দিন ভুলেও চাল, গম, যব, ডাল, সরিষা, ভুট্টা এবং কোনো প্রকার তেল গ্রহণ করা যাবে না। এমনকি ব্রত রক্ষার্থে এই দিন টুথপেস্ট বা দাতন ব্যবহার না করে শুধু জলের কুলকুচি করা উত্তম।
পূজাবিধি: তামার পাত্রে চন্দন, পুষ্প, ধূপ, দীপ এবং বিশেষ করে তুলসী পাতা দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা বিষ্ণুর পূজা করতে হবে। দেবীকে উৎপন্নাকেও ধূপ-দীপ অর্পণ করতে হবে।
নাম সংকীর্তন ও জাগরণ: সারাদিন পরনিন্দা, অসত্য ভাষণ, রাগ এবং ঘুম বর্জন করতে হবে। একাদশীর রাতে সম্পূর্ণ জেগে থেকে গীতা পাঠ, বিষ্ণু সহস্রনাম জপ এবং হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করার বিধান শাস্ত্রে রয়েছে।
৩. দ্বাদশী তিথির নিয়ম (ব্রত সমাপন বা পারণ)
- প্রাতঃস্নান ও পূজা: দ্বাদশীর দিন সকালে দ্রুত স্নান সেরে ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ পূজা ও আরতি করতে হবে।
- ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব ভোজন: নিজে ভোজন করার আগে কোনো সৎ ব্রাহ্মণ বা পরম বৈষ্ণবকে অন্ন ও দক্ষিণা দান করতে হবে অথবা কৃষ্ণপ্রসাদ খাওয়াতে হবে।
- পারণের খাদ্য: ভগবানকে নিবেদিত তুলসী পত্র সহ মহাপ্রসাদ (অন্ন, ডাল ইত্যাদি) গ্রহণ করে উপবাস ভঙ্গ করতে হবে।
- পারণের সময়: শাস্ত্রে বলা হয়েছে, দ্বাদশী তিথি থাকা অবস্থায় এবং হরিবাসর (দ্বাদশীর প্রথম এক-চতুর্থাংশ সময়) অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পারণ করতে হবে। সঠিক সময়ের বাইরে পারণ করলে ব্রতের ফল নষ্ট হয়।
উপসংহার
ভগবান বিষ্ণুর বরে উৎপন্না একাদশী হয়ে উঠলেন ভক্তের শত্রুবিনাশী, সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী এবং পরমগতি দাত্রী। এবং ধরাধামে মহাসমারোহে পালিত হতে শুরু করল উৎপন্না একাদশী। বলা হয় ভক্তি পরায়ন হয়ে এই উৎপন্না একাদশী ব্রতের মাহাত্ম্য ও উৎপত্তির কথা শ্রবণ-কীর্তন করলে শ্রী হরির অশেষ আশীর্বাদ লাভ এবং জীবনান্তে বৈকুণ্ঠবাস লাভ হয়। এছাড়াও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, অগ্রহায়ণ মাসের একাদশী তিথিতে যিনি শ্রদ্ধার সাথে ভগবান গদাধরের পূজা করেন এবং পরদিন দ্বাদশীতে পারণ করেন, তাঁর মানব জন্ম সার্থক হয়।
1 thought on “উৎপন্না একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য, ব্রতের ফল এবং ব্রত পালনের সঠিক নিয়ম”