গোত্রের পটভূমি
গোত্র কী?
ব্রহ্মা থেকে যেসকল ঋষিদের উৎপত্তি হয়েছে, তাদের থেকেই বিভিন্ন গোত্রের প্রবর্তন হয়েছে। সেই ঋষিদের থেকে যে বংশানুক্রমিক ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছে, ত-ই গোত্র নামে পরিচিত। সেসমস্ত ঋষির নামানুসারেই সেই সেই গোত্র পরিচিতি লাভ করে আসছে। পাণিণির সূত্রানুসারে (৪/১/৬২) “অপত্যং পৌত্রপ্রভৃতি গোত্রম্” অর্থাৎ, পৌত্র প্রভৃতির অপত্যগণের নাম গোত্র। গোত্র প্রসঙ্গে বৌধায়নের মত নিম্নরূপ-
বিশ্বামিত্রো জমদগ্নিভরদ্বাজোত্থ গৌতমঃ।অত্রিবশিষ্ঠঃ কশ্যপ ইত্যেতে সপ্তঋষয়।সপ্তানাং ঋষিনামগস্ত্যাষ্টমানাং যদপত্যং তদগোত্রম্।।
ঋষিনাং নাম-গোত্রানি-বংশাবতরণং তথা।প্রবরাণাং তথা সাম্যসাম্যং বিস্তরাদ্বদ।। (ম.পু.১৯৫/২)
মনু মৎসরূপী ভগবানকে জিজ্ঞেস করলেন- হে ভগবান। ঋষিগণের নাম, গোত্র, বংশ-বিবরণ ও প্রবরসমূহের সাম্য-অসাম্য ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছা করি।
মনুর সেই প্রশ্নের উত্তরে ভগবান মৎসরূপে পরপর কয়েকটি অধ্যায়ে ভৃগু, অঙ্গিরা, অত্রি, বিশ্বামিত্র, কশ্যপ, বশিষ্ঠ, পরাশর ও অগস্ত্যের গোত্র ও বংশের বর্ণনা করেন। এ দীর্ঘ আলোচনা স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয়। মৎস্যপুরাণের এ বর্ণনা হতে কীভাবে ব্রহ্মার সৃষ্ট ঋষিগণ হতে পরবর্তীকালে গোত্রের মাধ্যমে বৈদিক সংস্কৃতির ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছে তার বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এই শাখা বহু বিস্তার লাভ করে। সপ্তর্ষি হতে সৃষ্ট গোত্রের ধারা পরবর্তীকালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বহুধারায় বিভক্ত হয়।
গোত্র ও চতুর্বর্ণ
পূর্বের আলোচনা অনুসারে দেখা যায়, গোত্রপ্রবর্তক ঋষিগণ ব্রাহ্মণ ছিলেন। তবে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শুদ্র- এ চারটি বর্ণ ভীভাবে বিভাজিত হলো? সেক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মসূত্রে সকলেই ব্রাহ্মণ। কিন্তু ভগবদ্গীতার সিদ্ধান্ত অনুসারে বর্ণ বিন্যাস জন্মসূত্রে নয়, বরং গুণ অনুসারে নির্ণীত হয়। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (৪/১৩) বলেন-
চাতুবর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম।।
সমগোত্রে বিবাহ প্রসঙ্গে
অসপিন্ডা চ যা মাতুরসগোত্রা চ যা পিতুঃ।সা প্রশস্তা দ্বিজাতীনাং দারকর্মণি মৈথুনে।।
তাঁদের মতে, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ বিজ্ঞানসম্মত নয়। এধরনের সম্পর্কের ফলে যে সন্তান হয়, তার মধ্যে জন্মগত ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি প্রবল। দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা এ তথ্য জানিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরে বসবাসকারী পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক গবেষণা চালিয়ে দেখা যায়, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিবাহের মাধ্যমে জন্মগ্রহণকারী সন্তানের জিনগত অস্বভাবিকতার হার সাধারণ শিশুদের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এসব অস্বাভাবিকতার মধ্যে নবজাতকের অতিরিক্ত আঙ্গুল গজানোর মতো সমস্যা থেকে শুরু করে হৃৎপিন্ডে ছিদ্র বা মস্তিষ্কের গঠনপ্রক্রিয়ার ক্রুটি দেখা দিতে পারে। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ফিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এয়ারমন শেরিডান। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী সাড়ে ১৩ হাজার শিশুকে ওই গবেষণার আওতায় আনা হয়।ব্র্যাডফোর্ড শহরে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের বড় একটি অংশ বসবাস করে। সেখানে পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩৭ শতাংশই রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহের প্রচলন রয়েছে। সারা বিশ্বে ১০০ কোটির বেশি মানুষ এ রকম সংস্কৃতি ধারণ করে।
লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ যেন এই বৈদিক সত্যকেই নতুন করে উদঘাটন করে ঘোষণা দিলেন ল্যানসেট সাময়িকীতে।
তবে, মনু ও শতরূপা কি ভ্রাতা ও ভগিনীর ন্যায় ছিলো না?
উত্তর হচ্ছে না, কেননা, মন ও শতরূপা এ জগতের সাধারণ মানুষের ন্যায় যোনিগতভাবে জন্মলাভ করেননি। তারা পতি-পত্নীরূপেই ব্রহ্মা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। আবার, মনু ও শতরূপা থেকে যদি মানবজাতির বিকাশ হয়, তবে তাদের থেকে যাদের সৃষ্টি হয়েছে, তাদের দ্বারা কি ভ্রাতা ভগিনীর সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্টি বিস্তার হয়নি? এক্ষেত্রেও এ ধরনের কোনো সম্পর্ক হয়নি। কারণ, পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে, মনুর তিন কন্যাকে যথাক্রমে রুচি, কর্দম ও দক্ষের সাথে বিবাহ দেয়া হয়। তাই সেখানেও এ প্রশ্ন ওঠার কোনো সুযোগ নেই।
বৈষ্ণবগণ কেন অচ্যুতগোত্রীয়?
সপ্তর্ষি থেকে গোত্র প্রবর্তিত হলেও পরবর্তীকালে গোত্র ও প্রবরের মাধ্যমে বহু মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিগণের মাধ্যমে বহু গোত্র প্রবর্তিত হয়। গোত্রের সংখ্যা নিরূপণ করতে গিয়ে বৌধায়ন নিজেই বলেছেন-
গোত্রানাং তু সহস্রাণি প্রযুতান্যর্ব্বুদানিচ।উনপঞ্চাশদষৈাং প্রবরাঋষিদর্শনাৎ।।
সর্বত্রাস্থলিতাদেশঃ সপ্তীদ্বীপৈকদগুধৃক।অন্যত্র ব্রাক্ষণকুলাদন্যত্র অচ্যুতগোত্রতঃ
শ্রী অচ্যুতগোত্র বলি’ বৈষ্ণব-নির্দেশ।ইহার তাৎপর্য কিবা, ইথে কি বিশেষ”।।৪৫।।স্বরূপ বলে, “গৃহী, ত্যাগী উভয়ে সর্বথা।এই গোত্রে অধিকার নাহিক অন্যথা।।৪৬।।শ্রীঅচ্যুতগোত্রে থাকে শুদ্ধভক্ত যত।স্বধর্মনিষ্ঠায় কভু নাহি হয় রত।।৪৭।।সংসারের গোত্র ত্যজি’ কৃষ্ণগোত্র ভজে।সেই নিত্যগোত্র তার যেই বৈসে ব্রজে।।৪৮।।মধ্যমাধিকারী আর উত্তমাধিকারী।সকলে অচ্যুতগোত্র দেখহ বিচারি””।।৪৯।।
মুনি দ্বিজ শূদ্র ভেদ নাহিক বৈষ্ণবে।বৈষ্ণবগণের বাহা কৃষ্ণ গোত্র লভে।।পিতৃগোত্রেন যা কন্যা স্বামীগোত্রেন গোত্রিতা।তথা কৃষ্ণ ভক্ত মাত্রেণ অচ্যুত গোত্র ভবেৎ নৃণাং।।