ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, কুন্তী, বিদুর ও সঞ্জয় কিভাবে মারা গিয়েছিলেন?

জানেন কি মহাভারতের মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মহারাণী গান্ধারী, মাতা কুন্তি, মহামতি বিদুর এবং সঞ্জয়ের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল? আসলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরবর্তী সময়ের কাহিনী আমাদের মধ্যে খুব বেশী প্রচলিত নয়। যেকারনে আমরা অনেকেই জানি না পাণ্ডবদের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল অথবা পাণ্ডবদের পিতৃব্যদের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল। আজ আমরা জানবো ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, কুন্তি, বিদুর ও সঞ্জয়ের মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল সেই কাহিনীটি।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরবর্তী সময়

মহাভারতের এই বয়োজ্যেষ্ঠদের দেহাবসানের কাহিনী জানা যায় মহাভারতের আশ্রমবাসিক পর্ব থেকে।  কুরুক্ষেত্রের প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে প্রায় পনেরো বছর। মহারাজ যুধিষ্ঠির সিংহাসনে আসীন হলেও ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, বিদুর ও সঞ্জয় সসম্মানে বসবাস করছিলেন হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে। মহারাজ যুধিষ্ঠির নিজে যেমন তাদেরকে সম্মান করতেন তেমনি তার আদেশে বাকি পাণ্ডব ভ্রাতারাও তাদেরকে সম্মান করতেন।

যাইহোক, এভাবে কিছুদিন চলার পর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী সিদ্ধান্ত নিলেন তারা সংসার ত্যাগ করে বানপ্রস্থ জীবন অবলম্বন করবেন। এ সংবাদ শুনে দুঃখে ভেঙে পড়েন মহারাজ যুধিষ্ঠির। তিনি কাতর স্বরে ধৃতরাষ্ট্রকে অনুনয় করেছিলেন এই কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য। এর আগেও একবার ধৃতরাষ্ট্রের বানপ্রস্থের সিদ্ধান্ত বর্জন করতে হয়েছিল যুধিষ্ঠিরের অনুনয়ের কারনে। তবে এবার যুধিষ্ঠিরের  অনুরোধকে উপেক্ষা করতেই হল ধৃতরাষ্ট্রের।

বনবাস যাত্রা

কার্তিক মাসের পূর্ণিমার দিন রাজবেশ ছেড়ে বনবাসীর বেশ ধারণ করে বেরিয়ে পড়লেন ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী। ঠিক সেই সময়,  পাণ্ডবদের মাতা কুন্তী, কাকা বিদুর এবং সঞ্জয়ও বানপ্রস্থে তাঁদের সঙ্গী হলেন। যুধিষ্ঠির আপ্রাণ চেষ্টা করলেন পিতৃব্যদেরকে ফেরানোর জন্য। তবে শেষমেশ বিফল হয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে অশ্রুপাত করতে লাগলেন।

অরণ্যে পৌছে এই পাঁচ বনবাসী নির্মাণ করলেন ২টি কুটির। এর মধ্যে একটি কুটিরে কুন্তী ও গান্ধারী এবং আরেকটিতে বাকি তিনজন বসবাস করা শুরু করলেন। সেখানে বনের ফলমূল ভক্ষণ করে, এবং হোম-যজ্ঞ, ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে ঈশ্বর চিন্তা করে দিন কাটতে লাগল তাদের।

আরও পড়ুনঃ  কল্কি অবতার কি জন্ম নিয়েছেন? মহাপ্রলয়ের সময় কি উপস্থিত? When will Kalki Avatar end Kaliyuga

বিদুরের মৃত্যু

এভাবে দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল একটি বছর। এদিকে পঞ্চপাণ্ডব সহ পরিবারের সকলে বনবাসরত গুরুজনদের বিরহে ব্যাকুল হয়ে ঊঠলেন। তাই তাদের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে যুধিষ্ঠির তার পরিবার পরিজন নিয়ে চলে যান অরণ্যে। অরণ্যে পৌছে একটি কুটিরে বসে ধ্যানমগ্ন ধৃতরাষ্ট্রকে দেখতে পেলেন তারা। ধৃতরাষ্ট্রের সাথে কুশল বিনিময়ের পর যুধিষ্ঠির কাকা বিদুরের সংবাদ জানতে চান। তখন ধৃতরাষ্ট্র বলেন, বিদুর কয়েকদিন যাবত গঙ্গাতীরে বসে অনশন ব্রত পালন করছেন। সুতারাং বিদুর এখনো জীবিত আছেন কিনা তা তার জানা নেই। ধৃতরাষ্ট্রের কথা শুনে তড়িঘড়ি করে গঙ্গাতীরে চললেন যুধিষ্ঠির। দেখতে পেলেন, বটগাছের একটি প্রকাণ্ড ঝুরির নীচে মুমূর্ষু অবস্থায় চাপা পড়ে আছেন বিদুর। এই করুণ দৃশ্য দেখে যুধিষ্ঠির চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেলেন বিদুরের কাছে। এবং যুধিষ্ঠিরের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই প্রাণত্যাগ করেন মহামতি বিদুর। কাকা বিদুরের শোকে মহারাজ যুধিষ্ঠির যখন শোকে মুহ্যমান, তখন ব্যাসদেব প্রভৃতি ঋষিরা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “মহারাজ, মাণ্ডব্য নামক মুনির শাপে স্বয়ং ধর্মদেব বিদুর রূপে জন্ম নিয়েছিলেন। আপনি বৃথাই তাঁর জন্য দুঃখ করছেন। তিনি দেহত্যাগ করে শাপমুক্ত হয়েছেন।”

দেবর্ষি নারদের আগমন

বিদুরের মৃত্যুর পর তিন মাস আশ্রমে থেকে বিদুরের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন পাণ্ডবগণ। এরপর আবারও হস্তিনাপুরে ফিরে এসে রাজকার্যে মনযোগ দিলেন পাণ্ডব ভ্রাতারা।  এভাবে কেটে গেল আরও দুটি বছর। এরপর একদিন দেবর্ষি নারদ এলেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সাথে দেখা করতে। দেবর্ষিকে যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির জানতে পারলেন দেবর্ষি নারদ ধৃতরাষ্ট্রের আশ্রম ভ্রমণ করার পরে তার নিকটে এসেছেন। তাই অধীর আগ্রহ নিয়ে মহারাজ যুধিষ্ঠির দেবর্ষি নারদকে জিজ্ঞাসা করলেন,  “হে মুনিবর! আপনি কি আমার জ্যাঠামশাই, জ্যাঠাইমা, মা ও সঞ্জয়ের কোনো খবর জানেন? তাঁদের সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছিল? তাঁরা সবাই ভালো আছেন তো? তাঁদের কথা আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে। আপনি যদি তাঁদের ব্যাপারে কিছু জানেন তাহলে দয়া করে আমাকে বলুন।”

আরও পড়ুনঃ  গণেশের ১২ টি অবতারের পৌরাণিক কাহিনী || Mythological Story of 12 Incarnations of Lord Ganesha

ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর মৃত্যু

যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে নারদ বললেন, “মহারাজ, মহামতি বিদুরের দেহাবসানের পর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, দেবী গান্ধারী, দেবী কুন্তী ও সঞ্জয় খুব কঠোর তপস্যা শুরু করেন। সেসময় ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী শুধুমাত্র জল পান করে জীবনধারণ করতেন। দেবী কুন্তী প্রতি মাসে মাত্র একবার আহার করতেন ও সঞ্জয় পাঁচদিনে মাত্র একবার আহার করতেন। এছাড়াও তারা কুটিরে না থেকে অরণ্যের খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতেন।

একদিন এই চার বনবাসী গঙ্গায় স্নান করে গঙ্গার তীর ধরে আশ্রমের দিকে যাচ্ছিলেন। এমন সময় অরণ্যের মধ্যে জ্বলে ওঠে দুর্ণিবার এক  দাবানল। সেই ভীষণ দাবানলে মুহুর্তেই গ্রাস করে ফেলল সমগ্র বনভূমি।  এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে অভুক্ত থাকা ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর শরীরও ছিল দুর্বল। তাই তাদের পক্ষে দৌড়ে সেই আগুন থেকে বেরিয়ে আসা ছিল অসম্ভব। ধৃতরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছিলেন, তাদের অন্তিম সময় আগত। তাই তিনি সঞ্জয়কে বলেছিলেন, “তুমি অতি দ্রুত এই দাবানল থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করো। আমরা তিনজন এই অগ্নিতে আত্মহূতি দেব।”

ধৃতরাষ্ট্রের এই কথা শুনে সঞ্জয় মরিয়া হয়ে বললেন, “মহারাজ, আমি কিছুতেই আপনাদেরকে অগ্নিস্নান করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দেব না। নিজের চোখের সামনে আপনাদের এই করুণ মৃত্যু আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না।”  সঞ্জয়ের কথা শুনে ধৃতরাষ্ট্র ঈষৎ হাস্য করে উত্তর দিলেন, “হে সঞ্জয়, আমরা সংসার ত্যাগ করে বনবাসী হয়েছি। আমাদের উদ্দ্যেশ্য, পরমাত্মার সাথে মিলন। তাই দাবানলে ভস্মীভূত হয়ে আমাদের মৃত্যু হলে তা আমাদের জন্য ক্ষতিকারক নয়, বরং পূণ্যদায়ক।  কারণ জল, অগ্নি, বা বায়ুর কারণে মৃত্যু যোগবলে দেহত্যাগেরই সমতুল্য। একজন তপস্বী সর্বদা এরূপ মৃত্যুরই প্রত্যাশা করে।  তুমি আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা বা শোক করো না, দ্রুত এই দাবানল থেকে বেরিয়ে যাও। ”

অগত্যা দৃঢ়চিত্ত ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও মাতা কুন্তীকে ফেলেই দাবানল থেকে দৌড়ে রক্ষা পেলেন সঞ্জয়। দৌড়ে পালানোর সময় সঞ্জয় পিছনে ফিরে দেখতে পেলেন ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তি ধ্যানআসনে বসে অগ্নিকে আমন্ত্রন জানাচ্ছেন। আর এর কিছুক্ষনের মধ্যেই সর্বভূকের মত তাদের শরীরকে ছাই করে দিয়ে গেল বীভৎস সেই দাবানল।

আরও পড়ুনঃ  মহালয়া - মহিষাসুরমর্দিনির বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র || জানুন তাঁর জীবনের করুণ ইতিহাস || Birendra Krishna

সঞ্জয়ের হিমালয় যাত্রা

তবে অগ্নিকুণ্ডে দগ্ধ হওয়ার হাত থেকে সে যাত্রা রেহাই পেলেও অরণ্যে স্থির হতে পারছিলেন না সঞ্জয়। তিনি সেই তপোবনের তপস্বীদের কাছে ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তির দেহাবসানের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে চলে গিয়েছিলেন হিমালয়ের উদ্দেশ্যে।”

পঞ্চপাণ্ডবের শোক

এই হৃদয়বিদারক সংবাদ শ্রবণ করে হাহাকার করে উঠলেন পঞ্চপাণ্ডব ও অন্তঃপুরের বাসিন্দারা। পাণ্ডবদের বুকফাটা আর্তনাদ ও আর্তচিৎকার শুনে স্বয়ং দেবর্ষি নারদ ও বিগলিত হলেন।  তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “মহারাজ, আপনি কাঁদবেন না। বৃথা আগুনে তাঁদের মৃত্যু হয়নি। গঙ্গাস্নানে যাওয়ার আগে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অন্যান্য তপস্বীদের সঙ্গে নিয়ে এক যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন। যজ্ঞের শেষে পুরোহিতরা যজ্ঞের সেই আগুন নিয়ে ফেলেছিলেন অরণ্যের গহীনে। বায়ুদেবের ইচ্ছায় সেই যজ্ঞাগ্নিই পরবর্তীতে রূপ নিয়েছিল দাবানলের।  সুতরাং হে কুরুরাজ! আপনি তাঁদের জন্য দুঃখ করবেন না। তাঁরা নিজেদের ইচ্ছাতেই প্রাণত্যাগ করেছেন। এবং তাঁদের অবশ্যই স্বর্গলাভ হবে। আপনি এখন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তাঁদের শ্রাদ্ধাদি পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করুন।”

এভাবে নারদের স্বান্তনায় গুরুজন হারানোর শোক কিছুটা প্রশমিত হল পাণ্ডবদের।  তাঁরা সবাই মিলে গঙ্গার তীরে গিয়ে ধৃতরাষ্ট্র, কুন্তী ও গান্ধারীর পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করলেন। আর এভাবেই শেষ হল মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মহারাণী গান্ধারী, মাতা কুন্তী, মহামতি বিদুর ও সঞ্জয়ের দেহাবসানের কাহিনী।

Rate this post

Leave a Comment

error: Content is protected !!